ঢাকা ০১:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

দেশে ফেরার পর থেকেই যেন দম ফেলার ফুসরত পাচ্ছেন না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২৫ ডিসেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতেই দলের জ্যৈষ্ঠ নেতাদের উষ্ণ সংবর্ধনায় সিক্ত হন তিনি। সেখান থেকে পূর্ব নির্ধারিত সংবর্ধনাস্থল তিনশ’ ফিটে যেতেই লেগে যায় সোয়া তিন ঘণ্টা। মূলত পথে পথে মানুষের চাপের কারণেই এমনটি হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে তিনি মঞ্চে উঠলেন। শুরুতেই হাত নেড়ে অভিবাদন জানালেন নেতাকর্মীদের। এরপর একে একে যুগপতের শরিক নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। তবে তার জন্য নির্ধারিত আসনে না বসে সাধারণ চেয়ারে বসলেন।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর লাখো নেতাকর্মীকে কাছে পেয়ে নিজেও উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন। যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো তার মধ্যে।

বক্তব্যেও দেখা গেলো সেটির প্রতিফলন। তরুণ প্রজন্মকে দিলেন দেশ নিয়ে তার নতুন ভাবনার কথা। বললেন, এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আমি বলতে চাই ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ফর মাই কান্ট্রি। তার ১৬ মিনিটের পুরো বক্তব্যেই ছিলো উদারতার ছাপ। ভাষাশৈলী ও শব্দচয়নে ছিলো নতুনত্ব।

সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে মা বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। সব কিছু সেরে বাসায় ফেরেন রাতে।

শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দ্বিতীয় দিনে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বাবা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন। সেখান থেকে রওনা হন সাভারে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। অবশ্য পথেই সূর্যাস্ত হয়ে যেতে পারে, ভেবে সেখানে তার পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

নেতাকর্মীদের ভিড় অতিক্রম করে অবশেষে শুক্রবার রাত ১০টা ৪ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন তিনি। সবাইকে নিয়ে আবারও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে পরিদর্শন বইয়ে নিজেকে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্বাক্ষর করেন।

তৃতীয় দিনে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিলো ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত, পঙ্গু হাসপাতালে জুলাইয়ে আহতদের দেখতে যাওয়া ও নির্বাচন কমিশনে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্বাক্ষর করা এবং সেখান থেকে ধানমন্ডিতে শ্বশুরের বাসা হয়ে গুলশানে নিজের বাসায় ফেরা। তবে পঙ্গু হাসপাতালে জুলাইয়ে আহত রোগী না থাকায় সেখানের কর্মসূচি বাতিল করেন।

হাদির কবর জিয়ারত ও নির্বাচন কমিশনের কাজ শেষে বনানীতে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ও শ্বশুর মাহবুব আলীর কবর জিয়ারত করেন। সেখান থেকে গুলশানের বাসায় যান। বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটে এভার কেয়ার হাসপাতালে মা খালেদা জিয়াকে দেখার জন্য যান। সেখান থেকে বিকাল সোয়া ৫টায় ধানমন্ডিতে শ্বশুরের বাসা মাহবুব ভিলায় প্রবেশ করেন।

দেশে ফেরার পর দিন (২৬ ডিসেম্বর) থেকে একের পর এক যোগ দিচ্ছেন নানা কর্মসূচিতে। যেখানেই যাচ্ছেন, খবর পেয়েই জড়ো হয়ে যাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। তাদের আসার জন্য দলের পক্ষ থেকে কোনও নির্দেশনা না থাকলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা যে যার মতো হাজির হয়ে যাচ্ছেন৷ মূহূর্তেই কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে যাচ্ছে। আবার নেতাকর্মীদের আবেগকে সন্মান দিয়ে দল থেকেও এ ব্যাপারে কোনও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরায় নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। তেমনি তিনিও স্বস্তিবোধ করছেন। আগামী দিনে তিনি জাতির নেতৃত্ব দেবেন দেশবাসী সে অপেক্ষা করছে। মঞ্চে তার বাহ্যিক আচরণ ও নেতাকর্মীদের প্রতি শুভেচ্ছা বিনিময় সব কিছুই ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। বক্তব্যেও দায়িত্বশীলতা লক্ষ্য করেছি। আশা করি নতুন বাংলাদেশে তিনি নেতৃত্ব দেবেন।”

প্রথম দিন ২৫ ডিসেম্বর: বিমানবন্দরে পেলেন ফুলেল শুভেচ্ছা, পা রাখলেন দুর্বা ঘাসে

বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুর ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী ফ্লাইটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় তাকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

একইসঙ্গে তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবেদা রহমান ও একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকেও বরণ করে নেওয়া হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

বিমানবন্দর থেকে তিনশ’ ফিটের উদ্দেশে গাড়িতে উঠার আগে দুর্বা ঘাসে পা রাখেন। সেখানে রোমন্থন করেন দেশ মাতৃকার অতীত স্মৃতি।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বললেন

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেন তারেক রহমান। এ সময় পরস্পর কুশল বিনিময় করেন।

ভিআইপি লাউঞ্জ ছাড়লেন সবার আগে বাংলাদেশ লেখা বাসে, ফাঁকি দিতে পারলেন না নেতাকর্মীদের চোখ

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে তিনশ’ ফিটে সংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেয় তারেক রহমানের গাড়ি বহর। তিনি ছিলেন সবার আগে বাংলাদেশ লেখা লাল বাসে। এর আগে শুধু সাংবাদিক ছাড়া বহিরাগত কাউকে ঢুকতে কড়াকড়ি আরোপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তবে তারেক রহমানের গাড়ি বের হতেই বিমানবন্দর ক্যান্টিনের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের নামে স্লোগান ধরেন। তখন তাদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের। এক পর্যায়ে তার গাড়ি বহরের পেছনে ছোটেন নেতাকর্মীরা। এ সময় তারেক রহমান সামনের গ্লাস দিয়ে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান।

বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিটের পথে তারেক রহমান (ছবি: মহসীন কবির)বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিটের পথে তারেক রহমান (ছবি: মহসীন কবির)

বিমানবন্দর থেকে মঞ্চে পৌঁছলেন সোয়া তিন ঘণ্টায়

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পৌঁছার পর তারেক রহমানকে যেন এক মিনিটের জন্যও চোখের আড়াল করতে চাননি নেতাকর্মীরা। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিমানবন্দর থেকে নেতার গাড়ির সাথে পুরো রাস্তা হেঁটে আসলেন মঞ্চ পর্যন্ত।

ভিড় ঠেলে বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায় তারেক রহমানের। তিনি মঞ্চে উঠেন বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটে।

আগে থেকে প্রধান সড়কে অবস্থান নেওয়া অসংখ্য নেতাকর্মী তার গাড়ি বহরের পেছনে হেঁটে রওনা হন। বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত ও কাকলী মোড় হয়ে কুড়িল ফ্লাইওভার দিয়ে ৩০০ ফিটের দিকে প্রবেশ করে গাড়ি।

তখনও গাড়ির সামনে ও পেছনেসহ চারিদিকে নেতাকর্মী আর মাঝখানে পড়ে যায় গাড়ি বহর। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরকে বাধা দেয়নি। ৩০০ ফিট পৌঁছাতেই উচ্ছ্বসিত আনন্দে মেতে উঠেন লাখো নেতাকর্মী।

মঞ্চের চারপাশে তারেক তারেক স্লোগান, হাত নেড়ে জবাব দিলেন তিনি

মঞ্চে উঠতেই চারিদিকে তারেক তারেক স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। তখন ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন তারেক রহমান। এ সময় নেতাকর্মীদের হাত নেড়ে অভিবাদন জানান তিনি। নেতাকে এক নজর দেখার জন্য নেতাকর্মীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অনেকে হুড়োহুড়ি শুরু করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতায় শেষ পর্যন্ত কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঘটেনি।

যুগপতের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময়

মঞ্চে উঠেই যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তারেক রহমান। এর মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)’র চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনপিপি)’র চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) এর চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ করা ববি হাজ্জাজ। তারা তার সান্নিধ্য পেয়ে নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

শুরুতেই বললেন প্রিয় বাংলাদেশ, শুকরিয়া আদায় করলেন

বক্তব্যের শুরুতেই সবাইকে “প্রিয় বাংলাদেশ” বলে সম্বোধন করলেন তারেক রহমান। এ সময় সমস্বরে সবাই তার কথার সমর্থন জানালেন। তিনি বলেন, মঞ্চে উপস্থিত জাতীয় নেতৃবৃন্দ, আমার সামনে উপস্থিত প্রিয় ভাই ও বোনেরা এবং মিডিয়ার মাধ্যমে যারা সারা বাংলাদেশ থেকে এই অনুষ্ঠান দেখছেন, সবাইকে আসসালামু আলাইকুম।

আজ প্রথমে রাব্বুল আলামিনের দরবারে হাজার, লক্ষ-কোটি শুকরিয়া জানাতে চাই। রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি। আপনাদের দোয়ায় আপনাদের মাঝে এসেছি।

একাত্তর থেকে ২৪ এর গণতন্ত্রকামী যোদ্ধাদের স্মরণ

তারেক রহমান বলেন, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিলো।

ঠিক একইভাবে ৭৫ এর ৭ নভেম্বর  সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদিদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিলো।

একইভাবে পরবর্তীতে ৯০ এর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ ও খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে এনেছিলো।

কিন্তু তারপরও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি।

আমরা তারপর দেখেছি ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। একাত্তর সালে মানুষ যেমন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছিলো, ২০২৪ সালেও এদেশের ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক,  নারী-পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ সেদিন ৫ আগস্ট দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিলো। তাদের সবাইকে স্মরণ করছি।

যে বাংলাদেশের দেখেন একজন মা, সেই দেশ গড়ার ডাক

তারেক রহমান বলেন, আজ আমাদের সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার।

তিনি বলেন, এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, তেমনি সমতলেরও মানুষ আছে। এই দেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে।

আমরা চাই সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবো, যে বাংলাদেশর স্বপ্ন একজন মা দেখেন। সে রকম একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই।

যেই বাংলাদেশে একজন নারী ও শিশু যেই হোক না কেন নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে আবার নিরাপদে ফিরে আসতে পারে।

এ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, ৫ কোটির মতো শিশু ও চল্লিশ লক্ষের মতো প্রতিবন্ধী মানুষ ও কয়েক কোটি কৃষক শ্রমিক রয়েছে।

এ মানুষগুলোর একটা প্রত্যাশা আছে এই রাষ্ট্রের কাছে। একটা আকাঙ্ক্ষা আছে। আজ আমরা সবাই মিলে যদি ঐক্যবদ্ধ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে লক্ষ-কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশা আমরা পূরণ করতে পারবোই ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা একাত্তর সালে আমাদের শহিদরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য।

গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন হাদি

তারেক রহমান বলেন, বিগত ১৫ বছর স্বৈরাচারের সময় হাজার হাজার মানুষ গুম-খুনের শিকার হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিরীহ মানুষও অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জীবন দিয়েছেন।

২০২৪ সাল মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমরা দেখেছি কীভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য।

কয়েক দিন আগেও ২৪ এর আন্দোলনের এক সাহসী সদস্য শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। সে শহিদ হয়েছে।

ওসমান হাদি চেয়েছিলেন এদেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। এদেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক।

আজ ২৪ এর আন্দোলনে যারা শহিদ হয়েছেন, ওসমান হাদিসহ একাত্তরে যারা শহিদ হয়েছেন, বিভিন্ন স্বৈরাচারের সময়ে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন; এই মানুষগুলোর রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, তাহলে আসুন আমরা তাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।

যেখানে আমরা সবাই মিলে কাজ করবো। সবাই মিলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।

এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকে আজ গ্রহণ করতে হবে।যাতে করে এ দেশকে আমরা সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারি।

গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর যাতে আমরা দেশকে গড়ে তুলতে পারি।

আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ফর মাই কান্ট্রি

উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, আপনারা মার্টিন লুথার কিং-এর নাম শুনেছেন না? তার একটি বিখ্যাত ডায়ালগ আছে, আই হ্যাভ এ ড্রিম।

আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আমি বলতে চাই ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ফর মাই কান্ট্রি।

আজ এই পরিকল্পনা দেশের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যদি সেই পরিকল্পনা ও কার্যক্রমকে বাস্তবায়ন করতে হয়; এই জন সমুদ্রে যত মানুষ আছেন, সারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পক্ষের যত মানুষ উপস্থিত আছেন প্রত্যেক মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে । আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন ও সহযোগিতা করেন, ইনশাল্লাহ আমরা আই হ্যাভ প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবো।

মহানবী (সা.) এর ন্যায়পরায়নতার আলোকে দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন

তারেক রহমান বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবে, আমরা সবাই মিলে মহানবী (সা.) এর ন্যায়পরায়নতার আলোকে দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আমরা রাব্বুল আলামিনের দরবারে এই প্রার্থনা করি-হে রাব্বুল আলামিন, হে একমাত্র মালিক, হে একমাত্র পরওয়ার দিগার, হে একমাত্র রহমত দানকারী, হে একমাত্র সাহায্যকারী আজ আপনি যদি আমাদের রহমত দেন, তাহলে আমরা এ দেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো।

আর যদি আল্লাহর রহমত এ দেশের মানুষের পক্ষে থাকে, আল্লাহর সাহায্যে, আল্লাহর দয়া এ দেশের মানুষের ওপর থাকে, ইনশাআল্লাহ আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।

মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন

তারেক রহমান বলেন, আপনারা জানেন এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাবো। এই একটি মানুষ এ দেশের মাটি ও মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন।

বিগত দিনে তার সঙ্গে কী হয়েছে আপনারা প্রত্যেকেই সে সম্পর্কে অবগত আছেন।

সন্তান হিসেবে হিসেবে আমি চাইবো আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন। যাতে আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে তাওফিক দেন, ওনি যাতে সুস্থ হয়ে ওঠতে পারেন।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা সন্তান হিসেবে আমার মন হাসপাতালে আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, অর্থাৎ আপনাদের মতো মানুষদের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাই সেই মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে দিতে পারি না।

সেই জন্য হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতিসহ টেলিভিশনের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশের যারা আমাকে দেখছেন, আপনাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি আপনাদের সামে দাঁড়িয়েছি।

সংবর্ধনা থেকে গেলেন এভারকেয়ারে

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা খালেদা জিয়াকে দেখতে যান তারেক রহমান। সেখানেও আগে অবস্থান নেন বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। ভিড় অতিক্রম করেই এভারকেয়ারে পৌঁছে তার গাড়ি বহর। মায়ের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করে ও সার্বিক খোঁজ খবর নিয়ে রাতে গুলশানের বাসভবনে পৌঁছেন তিনি।

দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানালেন

দীর্ঘ ১৭ বছর পর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসন শেষে মাতৃভূমিতে ফিরে দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এই ধন্যবাদ জানান তিনি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর সুদূর লন্ডন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট নামে খ্যাত মহাসড়কে অগণিত মানুষের সমাগম ঘটে। ঐতিহাসিক ও নজীরবিহীন জনসমাগমে ঢাকা মহানগরী যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় দিন (২৬ ডিসেম্বর): জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত ও স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা

দেশে ফেরার দ্বিতীয় দিন (২৬ ডিসেম্বর) শেরে বাংলা নগরে বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাভারে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারেক রহমান। এদিন দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে বের হয় তার গাড়িবহর। তবে পথে পথে নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে সেখানে পৌঁছতে তার সোয়া এক ঘণ্টা লেগে যায়। বিকাল ৪টা ২৭ মিনিটে তিনি পৌঁছেন। সেখান থেকে তার গাড়িবহর রওনা দেয় সাভারের উদ্দেশে।

দীর্ঘ ১৯ বছর পর শেরে বাংলা নগরে বাবা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করতে যান তারেক রহমান। প্রথমে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। পরবর্তীতে নিজে আলাদা শ্রদ্ধা জানান। এ সময় সবাইকে নিয়ে মোনাজাত ও ফাতেহা পাঠ করেন। কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এর আগে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থাকাকালীন ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাবা জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন তারেক রহমান।

সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে সূর্যাস্তের আগে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছাতে না পারায় তারেক রহমানের পক্ষে সিনিয়র নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

মহান জাতীয় স্মৃতিসৌধ বেদিতে নিয়ম অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগে পৌঁছানোর সম্ভব না হওয়ায় বিকাল ৫টা ৬ মিনিটে তারেক রহমানের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য গয়েশ্বর রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান ও লুৎফুজ্জামান বাবর।

তবে নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে রাত ১০টা ৪ মিনিটে স্মৃতিসৌধে পৌঁছে তারেক রহমানের গাড়িবহর।

স্মতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালেন, পরিদর্শন বইয়ে লিখলেন রাজনৈতিক কর্মী

দেরিতে পৌঁছালেও নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় সবাইকে নিয়ে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সেখানে থাকা পরিদর্শন বইয়ে নিজের পরিচয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সই করেন।

সেখান থেকে রাত ১১টা ৫২ মিনিটে তার গাড়ি বহর গুলশানের বাসার সামনে পৌঁছায়।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

ছুটির দিনেও রাস্তায় চাপ

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরায় তারেক রহমানের প্রতি নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাসের মাত্রা ছিলো বেশি। শুধু তাকে একনজর দেখার জন্য গুলশান থেকে জিয়া উদ্যান পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে তিনি বাসা থেকে বের হন। তবে নেতাকর্মীদের চাপে তাকে ২০ মিনিটের রাস্তা সোয়া এক ঘণ্টায় অতিক্রম করতে হয়।দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর বিকাল ৪টা ২৭ মিনিটে জিয়া উদ্যানে সমাধিস্থলে পৌঁছে তাকে বহনকারী গাড়ি বহর।

তবে সেখান থেকে সাভারে যেতেও নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে যেতে রাত ১০টা বেজে যায়। বিশেষ করে গাবতলী ও হেমায়েতপুর অতিক্রম করতে বিলম্ব হয়েছে বলে জানা গেছে। ছুটির দিন হলেও এ কারণে দু’একটি জায়গায় যানজটের সৃষ্টি হয়।

তৃতীয় দিন (২৭ ডিসেম্বর): হাদির কবর জিয়ারত

দেশে ফেরার তৃতীয় দিনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। এ উপলক্ষে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে বের হয় তার গাড়ি বহর। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে হাদির সমাধিস্থলে পৌঁছান তিনি। আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদসহ শীর্ষ নেতারা। এছাড়াও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

হাদির কবর জিয়ারত শেষে তিনি ফাতেহা পাঠ করেন ও সবাইকে নিয়ে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন।

মোনাজাত পরিচালনা করেন হাদির বড় ভাই অধ্যক্ষ মাওলানা মুফতি আবু বক্কর ছিদ্দিক।

গুলশান থেকে হাদির সমাধিস্থলে পৌঁছান যে পথে

গুলশানের বাসা থেকে বের হয়ে বনানী হয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে এফডিসি মোড়, সাত রাস্তা হয়ে মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে নামার সময় হলিফ্যামিলী হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীরা ভিড় করায় সেখানে কিছুটা সময় দেরি হয় তারেক রহমানের।

তেজগাঁও থানা যুবদলের নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের গাড়ির সামনে স্লোগান দেয়। পরে ডিবি অফিসের সামনের মিন্টু রোড কদমফুল ফোয়ারা মোড়, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, শাহবাগ মোড় হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে ওসমান হাদির কবরের কাছে পৌঁছান তারেক রহমান।

১৮ মিনিটে ভোটার হলেন

হাদির কবর জিয়ারত শেষে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুর ১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের পেছনে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ দিতে যান তারেক রহমান। এ সময় ১৮ মিনিটে তার ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

এদিন বেলা ১২টা ২০ মিনিটের দিকে জাইমা রহমান ও তার মা জুবাইদা রহমান নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনের প্রবেশ করেন। পরে জাইমা রহমান তার ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১২টা ৪৫ মিনিটে ইটিআই ভবন ত্যাগ করেন।

ঢাকা-১৭ আসনে ভোটার হলেন

ভোটার হওয়ার জন্য অনলাইন ফরম পূরন করেন তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমান। তারা ভোটার হন ঢাকা ১৭ আসনের গুলশান এলাকার ডিএনসিসি ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। ভোটার নিবন্ধন শেষ করার ৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাবেন তারা। এনআইডি মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুর কবীর সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।

ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো’ কবর জিয়ারত

নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পরিচয় পত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপির মিডিয়া সেলের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন ভবন থেকে বের হয়ে তিনি সরাসরি বনানী কবরস্থানে যান। সেখানে প্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেন। পাশাপাশি তিনি শ্বশুরের কবরও জিয়ারত করেছেন। এরপর দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে গুলশানের বাসভবনে যান। সেখান থেকে বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটে ধানমন্ডিতে তার শ্বশুরের বাসার উদ্দেশে বের হন। বিকাল সোয়া ৫টায় সেখানে পৌঁছান।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

দেশবাসীকে ফের তারেক রহমানের ধন্যবাদ

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরার পর নিজেকে বরণ করে নেওয়া দেশবাসীকে প্রথম তিন দিনের কর্মসূচি শেষে ফের ধন্যবাদ জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি তিনি লেখেন, প্রিয় ভাই ও বোনেরা গত শুক্রবার দিনটা সারা জীবনের জন্য আমার হৃদয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আমি আবার আমার মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেছি। আপনাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ঢাকার রাস্তাজুড়ে মানুষের ঢল, আর লাখো মানুষের দোয়া… এই মুহূর্তগুলো আমি কোনও দিন ভুলতে পারবো না।

তারেক রহমান আরও লেখেন, সবার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। এই ফিরে আসা নিয়ে আমার আর আমার পরিবারের মনে যে ভালোবাসা আর সম্মান কাজ করছে, তা শুধুমাত্র কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা সব প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের পাশে ছিলেন, কখনও আশা হারাননি, আপনাদের সাহস আমাকে প্রতিনিয়ত শক্তি জোগায়।

তিনি বলেন, নাগরিক সমাজের মানুষজন, তরুণরা, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক… সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের ধন্যবাদ। আপনারাই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়, যখন এদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার পোস্টে লিখেছেন, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি দায়িত্বশীলতা ও যত্নের সঙ্গে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আর যারা আমার ফিরে আসার সময় নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করেছেন, সেই সাথে দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, সেইসব আইন-শঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সেবার গুরুত্ব অপরিসীম।

তিনি বলেন, আমি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছেন। গণতন্ত্র, বহুদলীয় সহাবস্থান এবং জনগণের অদম্য ইচ্ছা শক্তির ওপর জোর দেওয়া এসব ভাবনার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির আশাবাদ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বানকেও আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। এসব পরামর্শ আমি বিনয় ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমি শুধু কোনো স্বপ্নের কথা বলিনি, আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি বাস্তব পরিকল্পনার কথা বলেছি; যে বাংলাদেশে শান্তি ও মর্যাদা থাকবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করবে, আর প্রতিটি শিশু আশার আলো নিয়ে বড় হবে।

তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা সব বাংলাদেশিদের জন্য। একটি ঐক্যবদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের জন্য। সবাইকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার মত বাংলাদেশের জন্য।দেশে ফিরে আসার সময় আমাকে বরণ করে নেবার জন্য, আপনাদের ধন্যবাদ।

আল্লাহ বাংলাদেশকে এবং আপনাদের সবাইকে সব সময় তার রহমতে রাখুন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পুনরায় সরকারি ছুটি ঘোষিত হলো ৭ নভেম্বর: মন্ত্রিসভার বড় সিদ্ধান্ত

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

আপডেট সময় : ০৮:০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

দেশে ফেরার পর থেকেই যেন দম ফেলার ফুসরত পাচ্ছেন না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২৫ ডিসেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতেই দলের জ্যৈষ্ঠ নেতাদের উষ্ণ সংবর্ধনায় সিক্ত হন তিনি। সেখান থেকে পূর্ব নির্ধারিত সংবর্ধনাস্থল তিনশ’ ফিটে যেতেই লেগে যায় সোয়া তিন ঘণ্টা। মূলত পথে পথে মানুষের চাপের কারণেই এমনটি হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে তিনি মঞ্চে উঠলেন। শুরুতেই হাত নেড়ে অভিবাদন জানালেন নেতাকর্মীদের। এরপর একে একে যুগপতের শরিক নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। তবে তার জন্য নির্ধারিত আসনে না বসে সাধারণ চেয়ারে বসলেন।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর লাখো নেতাকর্মীকে কাছে পেয়ে নিজেও উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন। যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো তার মধ্যে।

বক্তব্যেও দেখা গেলো সেটির প্রতিফলন। তরুণ প্রজন্মকে দিলেন দেশ নিয়ে তার নতুন ভাবনার কথা। বললেন, এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আমি বলতে চাই ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ফর মাই কান্ট্রি। তার ১৬ মিনিটের পুরো বক্তব্যেই ছিলো উদারতার ছাপ। ভাষাশৈলী ও শব্দচয়নে ছিলো নতুনত্ব।

সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে মা বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। সব কিছু সেরে বাসায় ফেরেন রাতে।

শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দ্বিতীয় দিনে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বাবা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন। সেখান থেকে রওনা হন সাভারে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। অবশ্য পথেই সূর্যাস্ত হয়ে যেতে পারে, ভেবে সেখানে তার পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

নেতাকর্মীদের ভিড় অতিক্রম করে অবশেষে শুক্রবার রাত ১০টা ৪ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন তিনি। সবাইকে নিয়ে আবারও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে পরিদর্শন বইয়ে নিজেকে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্বাক্ষর করেন।

তৃতীয় দিনে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিলো ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত, পঙ্গু হাসপাতালে জুলাইয়ে আহতদের দেখতে যাওয়া ও নির্বাচন কমিশনে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্বাক্ষর করা এবং সেখান থেকে ধানমন্ডিতে শ্বশুরের বাসা হয়ে গুলশানে নিজের বাসায় ফেরা। তবে পঙ্গু হাসপাতালে জুলাইয়ে আহত রোগী না থাকায় সেখানের কর্মসূচি বাতিল করেন।

হাদির কবর জিয়ারত ও নির্বাচন কমিশনের কাজ শেষে বনানীতে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ও শ্বশুর মাহবুব আলীর কবর জিয়ারত করেন। সেখান থেকে গুলশানের বাসায় যান। বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটে এভার কেয়ার হাসপাতালে মা খালেদা জিয়াকে দেখার জন্য যান। সেখান থেকে বিকাল সোয়া ৫টায় ধানমন্ডিতে শ্বশুরের বাসা মাহবুব ভিলায় প্রবেশ করেন।

দেশে ফেরার পর দিন (২৬ ডিসেম্বর) থেকে একের পর এক যোগ দিচ্ছেন নানা কর্মসূচিতে। যেখানেই যাচ্ছেন, খবর পেয়েই জড়ো হয়ে যাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। তাদের আসার জন্য দলের পক্ষ থেকে কোনও নির্দেশনা না থাকলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা যে যার মতো হাজির হয়ে যাচ্ছেন৷ মূহূর্তেই কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে যাচ্ছে। আবার নেতাকর্মীদের আবেগকে সন্মান দিয়ে দল থেকেও এ ব্যাপারে কোনও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরায় নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। তেমনি তিনিও স্বস্তিবোধ করছেন। আগামী দিনে তিনি জাতির নেতৃত্ব দেবেন দেশবাসী সে অপেক্ষা করছে। মঞ্চে তার বাহ্যিক আচরণ ও নেতাকর্মীদের প্রতি শুভেচ্ছা বিনিময় সব কিছুই ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। বক্তব্যেও দায়িত্বশীলতা লক্ষ্য করেছি। আশা করি নতুন বাংলাদেশে তিনি নেতৃত্ব দেবেন।”

প্রথম দিন ২৫ ডিসেম্বর: বিমানবন্দরে পেলেন ফুলেল শুভেচ্ছা, পা রাখলেন দুর্বা ঘাসে

বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুর ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী ফ্লাইটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় তাকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

একইসঙ্গে তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবেদা রহমান ও একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকেও বরণ করে নেওয়া হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

বিমানবন্দর থেকে তিনশ’ ফিটের উদ্দেশে গাড়িতে উঠার আগে দুর্বা ঘাসে পা রাখেন। সেখানে রোমন্থন করেন দেশ মাতৃকার অতীত স্মৃতি।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বললেন

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেন তারেক রহমান। এ সময় পরস্পর কুশল বিনিময় করেন।

ভিআইপি লাউঞ্জ ছাড়লেন সবার আগে বাংলাদেশ লেখা বাসে, ফাঁকি দিতে পারলেন না নেতাকর্মীদের চোখ

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে তিনশ’ ফিটে সংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেয় তারেক রহমানের গাড়ি বহর। তিনি ছিলেন সবার আগে বাংলাদেশ লেখা লাল বাসে। এর আগে শুধু সাংবাদিক ছাড়া বহিরাগত কাউকে ঢুকতে কড়াকড়ি আরোপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তবে তারেক রহমানের গাড়ি বের হতেই বিমানবন্দর ক্যান্টিনের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের নামে স্লোগান ধরেন। তখন তাদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের। এক পর্যায়ে তার গাড়ি বহরের পেছনে ছোটেন নেতাকর্মীরা। এ সময় তারেক রহমান সামনের গ্লাস দিয়ে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান।

বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিটের পথে তারেক রহমান (ছবি: মহসীন কবির)বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিটের পথে তারেক রহমান (ছবি: মহসীন কবির)

বিমানবন্দর থেকে মঞ্চে পৌঁছলেন সোয়া তিন ঘণ্টায়

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পৌঁছার পর তারেক রহমানকে যেন এক মিনিটের জন্যও চোখের আড়াল করতে চাননি নেতাকর্মীরা। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিমানবন্দর থেকে নেতার গাড়ির সাথে পুরো রাস্তা হেঁটে আসলেন মঞ্চ পর্যন্ত।

ভিড় ঠেলে বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায় তারেক রহমানের। তিনি মঞ্চে উঠেন বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটে।

আগে থেকে প্রধান সড়কে অবস্থান নেওয়া অসংখ্য নেতাকর্মী তার গাড়ি বহরের পেছনে হেঁটে রওনা হন। বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত ও কাকলী মোড় হয়ে কুড়িল ফ্লাইওভার দিয়ে ৩০০ ফিটের দিকে প্রবেশ করে গাড়ি।

তখনও গাড়ির সামনে ও পেছনেসহ চারিদিকে নেতাকর্মী আর মাঝখানে পড়ে যায় গাড়ি বহর। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরকে বাধা দেয়নি। ৩০০ ফিট পৌঁছাতেই উচ্ছ্বসিত আনন্দে মেতে উঠেন লাখো নেতাকর্মী।

মঞ্চের চারপাশে তারেক তারেক স্লোগান, হাত নেড়ে জবাব দিলেন তিনি

মঞ্চে উঠতেই চারিদিকে তারেক তারেক স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। তখন ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন তারেক রহমান। এ সময় নেতাকর্মীদের হাত নেড়ে অভিবাদন জানান তিনি। নেতাকে এক নজর দেখার জন্য নেতাকর্মীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অনেকে হুড়োহুড়ি শুরু করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতায় শেষ পর্যন্ত কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঘটেনি।

যুগপতের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময়

মঞ্চে উঠেই যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তারেক রহমান। এর মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)’র চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনপিপি)’র চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) এর চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ করা ববি হাজ্জাজ। তারা তার সান্নিধ্য পেয়ে নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

শুরুতেই বললেন প্রিয় বাংলাদেশ, শুকরিয়া আদায় করলেন

বক্তব্যের শুরুতেই সবাইকে “প্রিয় বাংলাদেশ” বলে সম্বোধন করলেন তারেক রহমান। এ সময় সমস্বরে সবাই তার কথার সমর্থন জানালেন। তিনি বলেন, মঞ্চে উপস্থিত জাতীয় নেতৃবৃন্দ, আমার সামনে উপস্থিত প্রিয় ভাই ও বোনেরা এবং মিডিয়ার মাধ্যমে যারা সারা বাংলাদেশ থেকে এই অনুষ্ঠান দেখছেন, সবাইকে আসসালামু আলাইকুম।

আজ প্রথমে রাব্বুল আলামিনের দরবারে হাজার, লক্ষ-কোটি শুকরিয়া জানাতে চাই। রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি। আপনাদের দোয়ায় আপনাদের মাঝে এসেছি।

একাত্তর থেকে ২৪ এর গণতন্ত্রকামী যোদ্ধাদের স্মরণ

তারেক রহমান বলেন, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিলো।

ঠিক একইভাবে ৭৫ এর ৭ নভেম্বর  সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদিদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিলো।

একইভাবে পরবর্তীতে ৯০ এর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ ও খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে এনেছিলো।

কিন্তু তারপরও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি।

আমরা তারপর দেখেছি ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। একাত্তর সালে মানুষ যেমন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছিলো, ২০২৪ সালেও এদেশের ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ, কৃষক, শ্রমিক,  নারী-পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ সেদিন ৫ আগস্ট দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিলো। তাদের সবাইকে স্মরণ করছি।

যে বাংলাদেশের দেখেন একজন মা, সেই দেশ গড়ার ডাক

তারেক রহমান বলেন, আজ আমাদের সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার।

তিনি বলেন, এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, তেমনি সমতলেরও মানুষ আছে। এই দেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে।

আমরা চাই সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবো, যে বাংলাদেশর স্বপ্ন একজন মা দেখেন। সে রকম একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাই।

যেই বাংলাদেশে একজন নারী ও শিশু যেই হোক না কেন নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে আবার নিরাপদে ফিরে আসতে পারে।

এ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, ৫ কোটির মতো শিশু ও চল্লিশ লক্ষের মতো প্রতিবন্ধী মানুষ ও কয়েক কোটি কৃষক শ্রমিক রয়েছে।

এ মানুষগুলোর একটা প্রত্যাশা আছে এই রাষ্ট্রের কাছে। একটা আকাঙ্ক্ষা আছে। আজ আমরা সবাই মিলে যদি ঐক্যবদ্ধ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে লক্ষ-কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশা আমরা পূরণ করতে পারবোই ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা একাত্তর সালে আমাদের শহিদরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য।

গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন হাদি

তারেক রহমান বলেন, বিগত ১৫ বছর স্বৈরাচারের সময় হাজার হাজার মানুষ গুম-খুনের শিকার হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিরীহ মানুষও অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জীবন দিয়েছেন।

২০২৪ সাল মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমরা দেখেছি কীভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য।

কয়েক দিন আগেও ২৪ এর আন্দোলনের এক সাহসী সদস্য শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। সে শহিদ হয়েছে।

ওসমান হাদি চেয়েছিলেন এদেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। এদেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক।

আজ ২৪ এর আন্দোলনে যারা শহিদ হয়েছেন, ওসমান হাদিসহ একাত্তরে যারা শহিদ হয়েছেন, বিভিন্ন স্বৈরাচারের সময়ে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন; এই মানুষগুলোর রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, তাহলে আসুন আমরা তাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।

যেখানে আমরা সবাই মিলে কাজ করবো। সবাই মিলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।

এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকে আজ গ্রহণ করতে হবে।যাতে করে এ দেশকে আমরা সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারি।

গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর যাতে আমরা দেশকে গড়ে তুলতে পারি।

আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ফর মাই কান্ট্রি

উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, আপনারা মার্টিন লুথার কিং-এর নাম শুনেছেন না? তার একটি বিখ্যাত ডায়ালগ আছে, আই হ্যাভ এ ড্রিম।

আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আমি বলতে চাই ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ফর মাই কান্ট্রি।

আজ এই পরিকল্পনা দেশের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যদি সেই পরিকল্পনা ও কার্যক্রমকে বাস্তবায়ন করতে হয়; এই জন সমুদ্রে যত মানুষ আছেন, সারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পক্ষের যত মানুষ উপস্থিত আছেন প্রত্যেক মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে । আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন ও সহযোগিতা করেন, ইনশাল্লাহ আমরা আই হ্যাভ প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবো।

মহানবী (সা.) এর ন্যায়পরায়নতার আলোকে দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন

তারেক রহমান বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবে, আমরা সবাই মিলে মহানবী (সা.) এর ন্যায়পরায়নতার আলোকে দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আমরা রাব্বুল আলামিনের দরবারে এই প্রার্থনা করি-হে রাব্বুল আলামিন, হে একমাত্র মালিক, হে একমাত্র পরওয়ার দিগার, হে একমাত্র রহমত দানকারী, হে একমাত্র সাহায্যকারী আজ আপনি যদি আমাদের রহমত দেন, তাহলে আমরা এ দেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো।

আর যদি আল্লাহর রহমত এ দেশের মানুষের পক্ষে থাকে, আল্লাহর সাহায্যে, আল্লাহর দয়া এ দেশের মানুষের ওপর থাকে, ইনশাআল্লাহ আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।

মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন

তারেক রহমান বলেন, আপনারা জানেন এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাবো। এই একটি মানুষ এ দেশের মাটি ও মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন।

বিগত দিনে তার সঙ্গে কী হয়েছে আপনারা প্রত্যেকেই সে সম্পর্কে অবগত আছেন।

সন্তান হিসেবে হিসেবে আমি চাইবো আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন। যাতে আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে তাওফিক দেন, ওনি যাতে সুস্থ হয়ে ওঠতে পারেন।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা সন্তান হিসেবে আমার মন হাসপাতালে আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, অর্থাৎ আপনাদের মতো মানুষদের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাই সেই মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে দিতে পারি না।

সেই জন্য হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতিসহ টেলিভিশনের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশের যারা আমাকে দেখছেন, আপনাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি আপনাদের সামে দাঁড়িয়েছি।

সংবর্ধনা থেকে গেলেন এভারকেয়ারে

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা খালেদা জিয়াকে দেখতে যান তারেক রহমান। সেখানেও আগে অবস্থান নেন বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। ভিড় অতিক্রম করেই এভারকেয়ারে পৌঁছে তার গাড়ি বহর। মায়ের পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করে ও সার্বিক খোঁজ খবর নিয়ে রাতে গুলশানের বাসভবনে পৌঁছেন তিনি।

দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানালেন

দীর্ঘ ১৭ বছর পর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসন শেষে মাতৃভূমিতে ফিরে দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এই ধন্যবাদ জানান তিনি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর সুদূর লন্ডন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট নামে খ্যাত মহাসড়কে অগণিত মানুষের সমাগম ঘটে। ঐতিহাসিক ও নজীরবিহীন জনসমাগমে ঢাকা মহানগরী যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় দিন (২৬ ডিসেম্বর): জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত ও স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা

দেশে ফেরার দ্বিতীয় দিন (২৬ ডিসেম্বর) শেরে বাংলা নগরে বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাভারে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারেক রহমান। এদিন দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে বের হয় তার গাড়িবহর। তবে পথে পথে নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে সেখানে পৌঁছতে তার সোয়া এক ঘণ্টা লেগে যায়। বিকাল ৪টা ২৭ মিনিটে তিনি পৌঁছেন। সেখান থেকে তার গাড়িবহর রওনা দেয় সাভারের উদ্দেশে।

দীর্ঘ ১৯ বছর পর শেরে বাংলা নগরে বাবা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করতে যান তারেক রহমান। প্রথমে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। পরবর্তীতে নিজে আলাদা শ্রদ্ধা জানান। এ সময় সবাইকে নিয়ে মোনাজাত ও ফাতেহা পাঠ করেন। কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এর আগে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থাকাকালীন ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাবা জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন তারেক রহমান।

সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে সূর্যাস্তের আগে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছাতে না পারায় তারেক রহমানের পক্ষে সিনিয়র নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

মহান জাতীয় স্মৃতিসৌধ বেদিতে নিয়ম অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগে পৌঁছানোর সম্ভব না হওয়ায় বিকাল ৫টা ৬ মিনিটে তারেক রহমানের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য গয়েশ্বর রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান ও লুৎফুজ্জামান বাবর।

তবে নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে রাত ১০টা ৪ মিনিটে স্মৃতিসৌধে পৌঁছে তারেক রহমানের গাড়িবহর।

স্মতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালেন, পরিদর্শন বইয়ে লিখলেন রাজনৈতিক কর্মী

দেরিতে পৌঁছালেও নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় সবাইকে নিয়ে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সেখানে থাকা পরিদর্শন বইয়ে নিজের পরিচয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সই করেন।

সেখান থেকে রাত ১১টা ৫২ মিনিটে তার গাড়ি বহর গুলশানের বাসার সামনে পৌঁছায়।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

ছুটির দিনেও রাস্তায় চাপ

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরায় তারেক রহমানের প্রতি নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাসের মাত্রা ছিলো বেশি। শুধু তাকে একনজর দেখার জন্য গুলশান থেকে জিয়া উদ্যান পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে তিনি বাসা থেকে বের হন। তবে নেতাকর্মীদের চাপে তাকে ২০ মিনিটের রাস্তা সোয়া এক ঘণ্টায় অতিক্রম করতে হয়।দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর বিকাল ৪টা ২৭ মিনিটে জিয়া উদ্যানে সমাধিস্থলে পৌঁছে তাকে বহনকারী গাড়ি বহর।

তবে সেখান থেকে সাভারে যেতেও নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে যেতে রাত ১০টা বেজে যায়। বিশেষ করে গাবতলী ও হেমায়েতপুর অতিক্রম করতে বিলম্ব হয়েছে বলে জানা গেছে। ছুটির দিন হলেও এ কারণে দু’একটি জায়গায় যানজটের সৃষ্টি হয়।

তৃতীয় দিন (২৭ ডিসেম্বর): হাদির কবর জিয়ারত

দেশে ফেরার তৃতীয় দিনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। এ উপলক্ষে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে বের হয় তার গাড়ি বহর। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে হাদির সমাধিস্থলে পৌঁছান তিনি। আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদসহ শীর্ষ নেতারা। এছাড়াও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

হাদির কবর জিয়ারত শেষে তিনি ফাতেহা পাঠ করেন ও সবাইকে নিয়ে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন।

মোনাজাত পরিচালনা করেন হাদির বড় ভাই অধ্যক্ষ মাওলানা মুফতি আবু বক্কর ছিদ্দিক।

গুলশান থেকে হাদির সমাধিস্থলে পৌঁছান যে পথে

গুলশানের বাসা থেকে বের হয়ে বনানী হয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে এফডিসি মোড়, সাত রাস্তা হয়ে মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে নামার সময় হলিফ্যামিলী হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীরা ভিড় করায় সেখানে কিছুটা সময় দেরি হয় তারেক রহমানের।

তেজগাঁও থানা যুবদলের নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের গাড়ির সামনে স্লোগান দেয়। পরে ডিবি অফিসের সামনের মিন্টু রোড কদমফুল ফোয়ারা মোড়, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, শাহবাগ মোড় হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে ওসমান হাদির কবরের কাছে পৌঁছান তারেক রহমান।

১৮ মিনিটে ভোটার হলেন

হাদির কবর জিয়ারত শেষে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুর ১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের পেছনে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ দিতে যান তারেক রহমান। এ সময় ১৮ মিনিটে তার ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

এদিন বেলা ১২টা ২০ মিনিটের দিকে জাইমা রহমান ও তার মা জুবাইদা রহমান নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনের প্রবেশ করেন। পরে জাইমা রহমান তার ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১২টা ৪৫ মিনিটে ইটিআই ভবন ত্যাগ করেন।

ঢাকা-১৭ আসনে ভোটার হলেন

ভোটার হওয়ার জন্য অনলাইন ফরম পূরন করেন তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমান। তারা ভোটার হন ঢাকা ১৭ আসনের গুলশান এলাকার ডিএনসিসি ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। ভোটার নিবন্ধন শেষ করার ৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাবেন তারা। এনআইডি মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুর কবীর সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।

ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো’ কবর জিয়ারত

নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পরিচয় পত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপির মিডিয়া সেলের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন ভবন থেকে বের হয়ে তিনি সরাসরি বনানী কবরস্থানে যান। সেখানে প্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেন। পাশাপাশি তিনি শ্বশুরের কবরও জিয়ারত করেছেন। এরপর দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে গুলশানের বাসভবনে যান। সেখান থেকে বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটে ধানমন্ডিতে তার শ্বশুরের বাসার উদ্দেশে বের হন। বিকাল সোয়া ৫টায় সেখানে পৌঁছান।

কেমন কাটলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রথম তিন দিন

দেশবাসীকে ফের তারেক রহমানের ধন্যবাদ

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরার পর নিজেকে বরণ করে নেওয়া দেশবাসীকে প্রথম তিন দিনের কর্মসূচি শেষে ফের ধন্যবাদ জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি তিনি লেখেন, প্রিয় ভাই ও বোনেরা গত শুক্রবার দিনটা সারা জীবনের জন্য আমার হৃদয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আমি আবার আমার মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেছি। আপনাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ঢাকার রাস্তাজুড়ে মানুষের ঢল, আর লাখো মানুষের দোয়া… এই মুহূর্তগুলো আমি কোনও দিন ভুলতে পারবো না।

তারেক রহমান আরও লেখেন, সবার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। এই ফিরে আসা নিয়ে আমার আর আমার পরিবারের মনে যে ভালোবাসা আর সম্মান কাজ করছে, তা শুধুমাত্র কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা সব প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের পাশে ছিলেন, কখনও আশা হারাননি, আপনাদের সাহস আমাকে প্রতিনিয়ত শক্তি জোগায়।

তিনি বলেন, নাগরিক সমাজের মানুষজন, তরুণরা, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক… সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের ধন্যবাদ। আপনারাই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়, যখন এদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার পোস্টে লিখেছেন, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি দায়িত্বশীলতা ও যত্নের সঙ্গে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আর যারা আমার ফিরে আসার সময় নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করেছেন, সেই সাথে দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, সেইসব আইন-শঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সেবার গুরুত্ব অপরিসীম।

তিনি বলেন, আমি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছেন। গণতন্ত্র, বহুদলীয় সহাবস্থান এবং জনগণের অদম্য ইচ্ছা শক্তির ওপর জোর দেওয়া এসব ভাবনার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির আশাবাদ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বানকেও আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। এসব পরামর্শ আমি বিনয় ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমি শুধু কোনো স্বপ্নের কথা বলিনি, আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি বাস্তব পরিকল্পনার কথা বলেছি; যে বাংলাদেশে শান্তি ও মর্যাদা থাকবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করবে, আর প্রতিটি শিশু আশার আলো নিয়ে বড় হবে।

তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা সব বাংলাদেশিদের জন্য। একটি ঐক্যবদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের জন্য। সবাইকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার মত বাংলাদেশের জন্য।দেশে ফিরে আসার সময় আমাকে বরণ করে নেবার জন্য, আপনাদের ধন্যবাদ।

আল্লাহ বাংলাদেশকে এবং আপনাদের সবাইকে সব সময় তার রহমতে রাখুন।