ঢাকা ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

কাঠামোগত সংকটে বিপর্যস্ত দেশের শিক্ষাখাত

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৬:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য বার্ষিক গড় ব্যয় ২২৩ ডলার বা প্রায় ২৭ হাজার ২০৬ টাকা নির্ধারণ করা হলেও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরাদ্দের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে, যেখানে গবেষণা ও পাঠ্যক্রম সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। যোগ্য শিক্ষকের অভাব, পাঠ্যপুস্তকের সংকট এবং গ্রামীণ স্কুলগুলোতে বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের মতো নূন্যতম সুবিধার অনুপস্থিতি শ্রেণিকক্ষগুলোকে কেবল মুখস্থবিদ্যার কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে ৯৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.৬ শতাংশ বেশি হলেও জাতীয় বাজেটের মাত্র ১২.১ শতাংশ। এটি দেশের মোট জিডিপির ১.৫৩ শতাংশ মাত্র, যা ইউনেস্কোর প্রস্তাবিত ৪ থেকে ৬ শতাংশের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাখাতে জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করা ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান (৭%), ভারত (৪.৪%) এমনকি আফগানিস্তানও (৪.১%) বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি হারে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করছে।

শিক্ষার মান না বাড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে ব্যর্থতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতার অভাবকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপকরা মনে করেন, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে কেবল অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়ায় শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের ১০-১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৫১ শতাংশই বয়স-উপযোগী সাধারণ অনুচ্ছেদ পড়তে বা বুঝতে পারে না। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষকদের অনুপস্থিতির হার ২০-২৫ শতাংশ হওয়ায় বাজেটের বিশাল একটি অংশ অপচয় হচ্ছে।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও শিক্ষা নিয়ে সরকারের উদাসীনতা এবং একটি শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন না করাকে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯টি দেশের মধ্যে ১০৬তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল বাদে সবার নিচে। উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বেকার থাকায় অর্জিত ডিগ্রির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে থাকলেও ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপান্তরের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হত্যা: দপ্তরেই নির্মম বলি, নেপথ্যে বদলি বিতর্ক?

কাঠামোগত সংকটে বিপর্যস্ত দেশের শিক্ষাখাত

আপডেট সময় : ০৯:৫৬:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য বার্ষিক গড় ব্যয় ২২৩ ডলার বা প্রায় ২৭ হাজার ২০৬ টাকা নির্ধারণ করা হলেও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরাদ্দের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে, যেখানে গবেষণা ও পাঠ্যক্রম সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। যোগ্য শিক্ষকের অভাব, পাঠ্যপুস্তকের সংকট এবং গ্রামীণ স্কুলগুলোতে বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের মতো নূন্যতম সুবিধার অনুপস্থিতি শ্রেণিকক্ষগুলোকে কেবল মুখস্থবিদ্যার কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে ৯৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.৬ শতাংশ বেশি হলেও জাতীয় বাজেটের মাত্র ১২.১ শতাংশ। এটি দেশের মোট জিডিপির ১.৫৩ শতাংশ মাত্র, যা ইউনেস্কোর প্রস্তাবিত ৪ থেকে ৬ শতাংশের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাখাতে জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করা ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান (৭%), ভারত (৪.৪%) এমনকি আফগানিস্তানও (৪.১%) বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি হারে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করছে।

শিক্ষার মান না বাড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে ব্যর্থতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতার অভাবকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপকরা মনে করেন, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে কেবল অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়ায় শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের ১০-১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৫১ শতাংশই বয়স-উপযোগী সাধারণ অনুচ্ছেদ পড়তে বা বুঝতে পারে না। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষকদের অনুপস্থিতির হার ২০-২৫ শতাংশ হওয়ায় বাজেটের বিশাল একটি অংশ অপচয় হচ্ছে।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও শিক্ষা নিয়ে সরকারের উদাসীনতা এবং একটি শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন না করাকে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯টি দেশের মধ্যে ১০৬তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল বাদে সবার নিচে। উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বেকার থাকায় অর্জিত ডিগ্রির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে থাকলেও ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপান্তরের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।