রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও নাচোল এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলায় পানির স্তর নিচে নামছে প্রতিদিন। সম্প্রতি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (ওয়ারপো) সম্মেলন কক্ষে জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভায় রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলার ২৫টি উপজেলা এলাকাকে অতি উচ্চ পানি সংকট এলাকা ঘোষণা করা হয়। তবু থেমে নেই নলকূপ বসানোর কাজ। নামতে নামতে একটা সময় আর পানিই পাওয়া যাচ্ছে না। তখন নলকূপ তুলে অন্য জায়গায় বসানো হচ্ছে। এতে তৈরি হয়েছে শত শত মৃত্যুফাঁদ। সেই ফাঁদের গর্তে পড়ে মারা যায় শিশু সাজিদ (২)।
১০ ডিসেম্বর দুপুরে উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের কছির উদ্দিনের জমিতে থাকা গভীর নলকূপের পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে যায় শিশু সাজিদ। ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ৩২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পরদিন রাতে মাটির ৫০ ফুট নিচ থেকে সাজিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাজিদ ওই গ্রামের রাকিবুল ইসলামের ছেলে। সাজিদের বাবা ছেলের লাশ উদ্ধারের পর অভিযোগ করেছিলেন, এটি অবহেলাজনিত মৃত্যু। তিনি বিচার চান। তবে এখন তিনি মামলা করতে চাচ্ছেন না। এদিকে যিনি গর্তটি খুঁড়েছিলেন, সেই কছির উদ্দিন ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে আছেন। উপজেলা সেচ কমিটির অনুমোদন না নিয়েই অবৈধভাবে তিনি ওই গর্ত খুঁড়েছিলেন। ফলে এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকায় ২০১৫ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সিদ্ধান্ত নেয় নতুন করে কোনও গভীর নলকূপ বসাবে না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা আর গভীর নলকূপ বসাচ্ছেও না। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় সেমিডিপ বসানোর কাজ থেমে নেই। নলকূপ স্থাপনের ক্ষেত্রেও পানি পেতে একাধিক জায়গায় খনন করা হয়। তখন পড়ে থাকছে পরিত্যক্ত গর্তটি। এ রকম শত শত পরিত্যক্ত গর্ত রয়েছে এই অঞ্চলে। এগুলোর ব্যাসার্ধ ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি। যা তৈরি করা আছে মৃত্যুফাঁদ হিসেবে। শুধু সেচের পানি বিক্রির জন্য এগুলো তৈরি করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
অনুমোদন ছাড়াই পাঁচটি নলকূপ বসান কছির উদ্দিন
শিশু সাজিদের মৃত্যুর পর থেকে আত্মগোপনে আছেন কছির উদ্দিন। তিনিই মূলত নলকূপ খুঁড়েছিলেন। তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তার বড় ভাই আব্দুল করিমকেও পাওয়া যায়নি। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ। অগভীর নলকূপ বসানোর জন্য উপজেলা সেচ কমিটির কোনও অনুমোদন নেননি কছির উদ্দিন।
কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন, কছির উদ্দিন আগে বিদেশে ছিলেন। দেশে ফেরার পর পানির ব্যবসা শুরু করেন। এলাকায় পাঁচটি সেমিডিপ বসিয়েছেন তিনি একাই। এর মধ্যে একটি সেমিডিপ চালান মৎস্য খামারের নামে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে। দুটি বিদ্যুতের সংযোগ আছে সেচ নামেই। বাকি দুটি অন্য ব্যক্তির সেমিডিপ থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চালাচ্ছেন।
টাকা নিয়ে নলকূপ বসানোর অনুমতি দেন বিএমডিএর কর্মকর্তারা
বরেন্দ্র অঞ্চলে মূলত কৃষকদের সেচ দেওয়ার কাজটি করে থাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। কৃষিজমিতে সেচের জন্য এই অঞ্চলে তাদের কয়েক হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আরও কয়েক হাজার নলকূপ বসানো হয় ব্যক্তিমালিকানায়। বিদ্যমান সেচ আইন অনুযায়ী বিএমডিএর অধিক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার গভীর বা অগভীর নলকূপ স্থাপনের সুযোগ নেই। তারপরও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে উপজেলা সেচ কমিটিকে ম্যানেজ করে এসব অনুমোদন দেওয়া হয়। সবশেষ গেলো বছর তানোরে ৩২টি অগভীর নলকূপ বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নলকূপের গর্তে পড়ে দুই বছরের শিশুর মৃত্যু
অনুমোদনহীন অগভীর নলকূপ প্রায় আড়াই হাজার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে থেকে জানা গেছে, তানোর উপজেলায় সেচযন্ত্র আছে দুই হাজার ১৯৫টি। এগুলোর মধ্যে বিএমডিএর গভীর নলকূপ ৫২৯টি। ব্যক্তিমালিকানায় গভীর নলকূপ আছে ১৬টি, বাকিগুলো অগভীর। এর বাইরে প্রায় আড়াই হাজার অনুমোদনহীন অগভীর নলকূপ আছে। শুধু তানোরে নয়, গোটা রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে উপজেলায় সেচ কমিটির অনুমোদন ছাড়া শত শত অগভীর নলকূপ চলছে। এগুলো থেকে ৩০ থেকে ৪০ বিঘা পর্যন্ত জমিতে সেচ দেওয়া যায়। কোথাও মুরগির খামার, কোথাও আবাসিক কিংবা ক্ষুদ্রশিল্পের নামে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে নলকূপ বসিয়ে সেচপাম্প চালাচ্ছেন অনেকেই।
নিষেধাজ্ঞাতেও থেমে নেই নলকূপ বসানোর কাজ
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানি কমছেই। কোথাও কোথাও মাটির ২০০ ফুট গভীরে পানির স্তর পাওয়া যায় না। তাই এই তিন জেলার চার হাজার ৯১১ মৌজায় এখন খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। গত ৬ নভেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়। তবু অগভীর নলকূপ বসানো থেমে নেই।
পানি সংকট নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, এই সংকটের মধ্যেও অবৈধভাবে নতুন নতুন অগভীর নলকূপ ব্যক্তিমালিকানায় বসানো হচ্ছে। স্থানীয় উন্নয়নকর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি দামি ব্যবসা। এখান থেকে ভালো মুনাফা হয়। অন্তত ৭৫ শতাংশ লাভ। তাই অবৈধভাবে অগভীর নলকূপ বসানোর প্রতিযোগিতা চলছে। বিএমডিএর যত গভীর নলকূপ রয়েছে, তারও বেশি আছে অগভীর নলকূপ।’
জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, ‘এমনিতে মাটির নিচে পানি নেই। তাই মাঝে মাঝে আমরা দেখি, দুই বছর পর এক স্থান থেকে অগভীর নলকূপ সরিয়ে অন্য জায়গায় বসানো হচ্ছে। এটাকে রিবোরিং বলা হয়। খুঁজলে দেখা যাবে, তিন ভাগের এক ভাগ অগভীর নলকূপ এভাবে স্থান বদল করেছে। স্থান পরিবর্তনের পর পাইপের গর্তটিও অনেক স্থানে থেকে গেছে। আবার নতুন অগভীর নলকূপ বসানোর সময় নিচে পানির লেয়ার পাওয়া যায় না। তখন এক স্থান বোরহোলের পর আবার অন্য স্থানে বোরহোল করতে হয়। এভাবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে শত শত গর্ত আছে। যেগুলোতে ঘটছে দুর্ঘটনা।’
মাটির ৫০ ফুট নিচ থেকে সাজিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়
৯০ ফুটের গর্তে পড়ে ছিল শিশু সাজিদ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানি ব্যবসায় ভালো লাভ হওয়ায় প্রায় এক বছর আগে শিশু সাজিদদের বাড়ির পাশে নিজের জমিতে আরেকটি অগভীর নলকূপ বসানোর চেষ্টা করেন কছির উদ্দিন। এজন্য পর পর তিনটি স্থানে মিস্ত্রিদের দিয়ে বোরহোল করান। কিন্তু ৯০ ফুটের পরও সেখানে পানি পাওয়া যায়নি। বরং বোরহোলের পাইপ দিয়ে পাথর উঠে আসছিল। তাই এখানে নলকূপ বসানো হয়নি। তারপর সামান্য খড়কুটা ও মাটি দিয়ে বোরহোলের মুখ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি বৃষ্টিপাতে এলাকাটি তলিয়ে যায়। তখন বোরহোলের মুখের মাটি ও খড় পানির সঙ্গে নিচে নেমে গেলে বোরহোলের মুখ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এতে পড়ে যায় শিশু সাজিদ।
সাজিদের মা রুনা খাতুন বলেন, ‘কছির উদ্দিন তিন জায়গায় বোরহোল করে ফেলে রেখেছিল। সেখানে পড়ে সাজিদ মারা গেলো। আমি কছির উদ্দিনের শাস্তি চাই।’
বিভাগের সব জেলার গভীর নলকূপের তথ্য চেয়েছে প্রশাসন
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান বলেন, ‘কছির উদ্দিনের অবহেলার কারণেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ভিকটিমের পরিবার যেভাবে চাইবে, সেভাবেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন ইউএনও। আরও যেসব গর্ত আছে সেগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গভীর নলকূপের জন্য খোঁড়া উন্মুক্ত গর্তে দুর্ঘটনা রোধে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে সব নলকূপের তথ্য চাওয়া হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে এ তথ্য চাওয়া হয়। আমরা তাদের সব তথ্য দেবো, তারা কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন।’
রিপোর্টারের নাম 
























