দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থার অসংবেদনশীলতা তরুণ প্রজন্মের আত্মসম্মানে এমনভাবে আঘাত করেছে যে, তা এখন রাজপথ ও অনলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবল প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছে। বন্যার চরম প্রতিকূলতায় হাঁটুজল ঠেলে পরীক্ষা দিতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বা ‘ব্রয়লার চিকেন’ সম্বোধন করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তা কেবল একটি মন্তব্য নয়, বরং তরুণদের অহংবোধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ। যদিও মন্ত্রী পরবর্তীতে ভুল স্বীকার করেছেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে এই ক্ষমা প্রার্থনা যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। তাদের ভাষায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করে যখন বছরের মাঝামাঝি সময়ে পাঠ্যবই পরিবর্তন বা একপাক্ষিক পরীক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই শিক্ষার্থীরা গড়ে তুলেছে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’, যা মূলত বিদ্যমান অসংবেদনশীল ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতীকী ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ।
শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের মূলে রয়েছে কাঠামোগত ত্রুটি। তারা অভিযোগ করছে, সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল পরীক্ষার রেজাল্টের ভিত্তিতে তাদের বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শাখায় বিভক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া ২০২৫ সালের সিলেবাসের জটিলতা, অভিন্ন প্রশ্নপত্র এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়ার জেদ তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতি তাদের আত্মহননের মতো চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার প্রমাণ সাম্প্রতিক একটি আত্মহত্যার ঘটনা। শিক্ষার্থীদের মতে, নীতিনির্ধারকরা কেবল পরীক্ষার পদ্ধতি বা নকল ধরার মতো সাময়িক বিষয়ে ব্যস্ত, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার যে আনন্দহীনতা এবং বৈষম্যমূলক কাঠামো, তা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেই। তাদের এই লড়াই কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মূলত নিজেদের মর্যাদা ও ভবিষ্যতের সুরক্ষায় এক সম্মিলিত প্রতিবাদ।
বিংশ শতাব্দীর তরুণদের এই ‘জেনারেশন জি’ বা ‘আলফা’ প্রজন্ম চিরাচরিত স্লোগান ছেড়ে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের ভাষা বেছে নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর অপমানজনক মন্তব্যকে তারা নিজেদের শক্তির ঢাল বানিয়ে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা প্রমাণ করে যে বলপ্রয়োগ বা উপদেশের মাধ্যমে এখনকার তরুণদের নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সংকটের সমাধান কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা নয়। মন্ত্রী যেহেতু শিক্ষার্থীদের আস্থা পুরোপুরি হারিয়েছেন, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তার সম্মানজনক বিদায়ই হতে পারে সংকট নিরসনের একমাত্র উপায়। শিক্ষার্থীদের জীবনের চেয়ে কোনো রাজনৈতিক পদ বা ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম বড় হতে পারে না। এখন নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—তারা কি তরুণদের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে গঠনমূলক সংস্কারে হাত দেবেন, নাকি অসংবেদনশীলতা বজায় রেখে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করবেন?
রিপোর্টারের নাম 
























