ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘টার্গেট কিলিং’-এ আতঙ্কিত সম্ভাব্য প্রার্থী ও রাজনীতিকরা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:২০:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৯ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থী ও রাজনীতিকদের লক্ষ্য করে ‘টার্গেট কিলিং’-এর ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিশেষ করে নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে গণজমায়েতের সুযোগে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমএম নাসির উদ্দিন, চার নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে সারা দেশে ইসির মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শনিবার আলাদা চিঠিতে পুলিশকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এরই মধ্যে সরকার জানিয়েছে যে প্রার্থীরা তাঁদের নিরাপত্তার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। অন্যদিকে, দেশের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে শনিবার সরকারকে চিঠি দিয়েছে ইসি। এই ঘটনার মধ্যেই শুক্রবার মধ্যরাতে লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করেছে এবং প্রায় একই সময়ে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শনিবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির জরুরি বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। অপরদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক করেন এবং মাঠ কর্মকর্তা ও কার্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশনা দেন। নির্বাচন অফিসগুলোর নিরাপত্তায় আনসার মোতায়েনে জটিলতা দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে সরকার ও ইসি আশা করলেও, ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী জুলাইযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। পাশাপাশি নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসি। কমিশন মনে করছে, নির্বাচন বানচাল করতে অথবা আতঙ্ক ছড়িয়ে ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। ইসি কর্মকর্তারা শনিবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করে তাঁদের সারা দেশের এসব ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা দেন।

এদিকে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, তারা যদি ‘হাতিয়ার’ (অস্ত্র) চান, তাঁদের হাতিয়ারের লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং যেসব অংশগ্রহণকারীর হাতিয়ার জমা আছে, সেগুলোও ফেরত দেওয়া হবে। অপরদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে যেভাবে গুলি করা হয়েছে, তা সবার জন্য ‘আই ওপেনিং’ ঘটনা এবং এটি নিন্দনীয়। তিনি জানান, নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে ইসির পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচন অফিসগুলোর নিরাপত্তার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার ও ইসি নানা পদক্ষেপ নিলেও নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন রাজনীতিকরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ২০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রকাশ্য দিবালোকে ওসমান হাদিকে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ গুলি করার ঘটনা সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, নির্বাচনি প্রচারে গণসংযোগের সময় সাধারণ মানুষের বেশে দুর্বৃত্তরা হামলা চালালে আগাম জানা কঠিন হবে। গত ৫ নভেম্বর নির্বাচনি জনসংযোগকালে চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, যেখানে একজন নিহত হন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে প্রকাশ্যে গুলি করে খুনের ঘটনা বেড়েছে। প্রার্থীরা শঙ্কিত যে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়তে পারে। তাঁরা মনে করেন, বিশেষ করে অনেক প্রার্থীর ব্যক্তিগত গাড়ি বা বডিগার্ড রাখার সামর্থ্য না থাকায় প্রচার-প্রচারণায় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সরকার দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি এবং অস্ত্র উদ্ধারও করতে পারেনি। নতুন করে হাদির ওপর ঘটনা ঘটেছে, যা সরকারের ব্যর্থতা। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বাইরে থাকা অস্ত্র উদ্ধার এবং নতুন করে কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শুধু প্রার্থী নয়, জনগণও শঙ্কিত। তিনি মনে করেন, ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে সমাজের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের প্রধানতম দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সাধারণ জনগণও এখন অনিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় না আনার কারণে তারা এখনো অপরাধ করার সুযোগ পাচ্ছে এবং গোয়েন্দা বাহিনী, পুলিশ প্রশাসন কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রত্যেক প্রার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে ফেলেছে এবং পতিত ফ্যাসিস্টরা ও নানান স্বার্থশক্তি নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে বলে সহজেই অনুমান করা যায়। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে নিয়ন্ত্রণে আসার দরকার ছিল, সে অবস্থায় নেই এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে কোনো নিয়ন্ত্রণও বোঝা যাচ্ছে না, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়াদের ভাবিয়ে তুলেছে।

এদিকে, ইসির পক্ষ থেকে সিইসিসহ চার নির্বাচন কমিশনার এবং ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবের বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে ডিএমপি কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে সিইসির জন্য নির্বাচনকালীন অতিরিক্ত আরও একটি গাড়িসহ পুলিশি নিরাপত্তা এবং চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিবের বাসভবন, অফিস যাতায়াতসহ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য গাড়িসহ পুলিশি নিরাপত্তা দিতে বলা হয়েছে। পুলিশের আইজিকে দেওয়া আরেক চিঠিতে লক্ষ্মীপুর ও মঠবাড়িয়ায় নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে মাঠপর্যায়ের ইসির কার্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করে সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

‘টার্গেট কিলিং’-এ আতঙ্কিত সম্ভাব্য প্রার্থী ও রাজনীতিকরা

আপডেট সময় : ০২:২০:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থী ও রাজনীতিকদের লক্ষ্য করে ‘টার্গেট কিলিং’-এর ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিশেষ করে নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে গণজমায়েতের সুযোগে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমএম নাসির উদ্দিন, চার নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে সারা দেশে ইসির মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শনিবার আলাদা চিঠিতে পুলিশকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এরই মধ্যে সরকার জানিয়েছে যে প্রার্থীরা তাঁদের নিরাপত্তার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। অন্যদিকে, দেশের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে শনিবার সরকারকে চিঠি দিয়েছে ইসি। এই ঘটনার মধ্যেই শুক্রবার মধ্যরাতে লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করেছে এবং প্রায় একই সময়ে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শনিবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির জরুরি বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। অপরদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক করেন এবং মাঠ কর্মকর্তা ও কার্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশনা দেন। নির্বাচন অফিসগুলোর নিরাপত্তায় আনসার মোতায়েনে জটিলতা দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে সরকার ও ইসি আশা করলেও, ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী জুলাইযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। পাশাপাশি নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসি। কমিশন মনে করছে, নির্বাচন বানচাল করতে অথবা আতঙ্ক ছড়িয়ে ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। ইসি কর্মকর্তারা শনিবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করে তাঁদের সারা দেশের এসব ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা দেন।

এদিকে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, তারা যদি ‘হাতিয়ার’ (অস্ত্র) চান, তাঁদের হাতিয়ারের লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং যেসব অংশগ্রহণকারীর হাতিয়ার জমা আছে, সেগুলোও ফেরত দেওয়া হবে। অপরদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে যেভাবে গুলি করা হয়েছে, তা সবার জন্য ‘আই ওপেনিং’ ঘটনা এবং এটি নিন্দনীয়। তিনি জানান, নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে ইসির পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচন অফিসগুলোর নিরাপত্তার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার ও ইসি নানা পদক্ষেপ নিলেও নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন রাজনীতিকরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ২০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রকাশ্য দিবালোকে ওসমান হাদিকে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ গুলি করার ঘটনা সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, নির্বাচনি প্রচারে গণসংযোগের সময় সাধারণ মানুষের বেশে দুর্বৃত্তরা হামলা চালালে আগাম জানা কঠিন হবে। গত ৫ নভেম্বর নির্বাচনি জনসংযোগকালে চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, যেখানে একজন নিহত হন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে প্রকাশ্যে গুলি করে খুনের ঘটনা বেড়েছে। প্রার্থীরা শঙ্কিত যে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়তে পারে। তাঁরা মনে করেন, বিশেষ করে অনেক প্রার্থীর ব্যক্তিগত গাড়ি বা বডিগার্ড রাখার সামর্থ্য না থাকায় প্রচার-প্রচারণায় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সরকার দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি এবং অস্ত্র উদ্ধারও করতে পারেনি। নতুন করে হাদির ওপর ঘটনা ঘটেছে, যা সরকারের ব্যর্থতা। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বাইরে থাকা অস্ত্র উদ্ধার এবং নতুন করে কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শুধু প্রার্থী নয়, জনগণও শঙ্কিত। তিনি মনে করেন, ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে সমাজের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের প্রধানতম দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সাধারণ জনগণও এখন অনিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় না আনার কারণে তারা এখনো অপরাধ করার সুযোগ পাচ্ছে এবং গোয়েন্দা বাহিনী, পুলিশ প্রশাসন কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রত্যেক প্রার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে ফেলেছে এবং পতিত ফ্যাসিস্টরা ও নানান স্বার্থশক্তি নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে বলে সহজেই অনুমান করা যায়। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে নিয়ন্ত্রণে আসার দরকার ছিল, সে অবস্থায় নেই এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে কোনো নিয়ন্ত্রণও বোঝা যাচ্ছে না, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়াদের ভাবিয়ে তুলেছে।

এদিকে, ইসির পক্ষ থেকে সিইসিসহ চার নির্বাচন কমিশনার এবং ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবের বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে ডিএমপি কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে সিইসির জন্য নির্বাচনকালীন অতিরিক্ত আরও একটি গাড়িসহ পুলিশি নিরাপত্তা এবং চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিবের বাসভবন, অফিস যাতায়াতসহ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য গাড়িসহ পুলিশি নিরাপত্তা দিতে বলা হয়েছে। পুলিশের আইজিকে দেওয়া আরেক চিঠিতে লক্ষ্মীপুর ও মঠবাড়িয়ায় নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে মাঠপর্যায়ের ইসির কার্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করে সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।