ঢাকা ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

৭১-এর এই দিনে শহীদ টিটোর আত্মত্যাগে হানাদারমুক্ত হয় সাভার

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

১৪ ডিসেম্বর— ঢাকার সাভারের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী সাভার-আশুলিয়া এলাকা ছেড়ে পিছু হটে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটোর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শত্রুমুক্ত হয় সাভার। স্বাধীনতার ঠিক আগ মুহূর্তে তার রক্তে রঞ্জিত হয় এই জনপদের মাটি।

শহীদ গোলাম মোহাম্মদ দস্তগীর টিটো ছিলেন সাভারের সম্মুখসারির একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া মাত্র ১৬ বছরের টগবগে এই কিশোর মানিকগঞ্জের উত্তর শেওতা গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। তিনি সে সময় দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। অসীম সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ৮ ডিসেম্বর সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার ইয়ারপুর ইউনিয়নের তৈয়বপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান নেন টিটো এবং একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের বরাতে জানা যায়, ২ নম্বর সেক্টরের অধীন অর্ধশতাধিক গেরিলা যোদ্ধা আশুলিয়ার গাজীবাড়ী এলাকায় নেদুখাঁর বাড়িতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেন। সেখানে কয়েক শ নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে দেড় মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বে আশুলিয়ার তৈয়বপুর এলাকায় আরও একটি ক্যাম্প স্থাপিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইল থেকে পালিয়ে আসা শত্রুসেনারা সাভারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে। ১৪ ডিসেম্বর সকালে আশুলিয়ার ঘোষবাগ এলাকায় তারা অবস্থান নিলে মুক্তিযোদ্ধারা শ্রীগঙ্গা কাঁঠালবাগানে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় হানাদার বাহিনী পিছু হটতে শুরু করলে বিজয়ের উল্লাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে সামনে এগিয়ে যান কিশোর যোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটো। সহযোদ্ধাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় পাক বাহিনীর বুলেটে শহীদ হন তিনি। তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সাভার-আশুলিয়া পুরোপুরি হানাদারমুক্ত হয়।

শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা টিটোকে সমাহিত করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীত পাশে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসংলগ্ন ডেইরি গেট এলাকায়। প্রতি বছর দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদ টিটোর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় এবং তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া–মুনাজাত করে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাভার-আশুলিয়া এলাকায় পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার-আল বদর-আল শামস ব্যাপক নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। স্থানীয় শান্তি কমিটির সহযোগিতায় বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ সময় বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান।

১৪ ডিসেম্বরের যুদ্ধ ছাড়াও সাভারে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয়। মধুরআঁটি এলাকায় দিকভ্রান্ত পাকসেনার ওপর আক্রমণে নেতৃত্ব দেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও কাদের কমান্ডার। অন্যদিকে বিরুলিয়া ইউনিয়নের রুস্তমপুর এলাকায় আরেকটি সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেন মিরপুরের যোদ্ধারা। ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে শত্রুসেনারা পুরোপুরি ঢাকার দিকে পালিয়ে গেলে সাভার সম্পূর্ণ মুক্ত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সাভারে নির্মিত হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এ ছাড়া আছে ‘সংশপ্তক’, ‘অমর একুশে’ ও ‘বিজয় যাত্রা’ ভাস্কর্য। ডেইরি ফার্ম গেট এলাকায় রয়েছে শহীদ টিটোর স্মৃতিস্তম্ভ ‘টিটোর স্বাধীনতা’। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম ঘোষক আবুল কাশেম সন্দ্বীপের নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।

সাভারবাসী আজও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে শহীদ টিটোসহ সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে, যাদের আত্মত্যাগে ১৪ ডিসেম্বর সাভার পেলো স্বাধীনতার প্রথম আলো।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীর ছয় থানা এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৬০ জন গ্রেপ্তার

৭১-এর এই দিনে শহীদ টিটোর আত্মত্যাগে হানাদারমুক্ত হয় সাভার

আপডেট সময় : ১১:১৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

১৪ ডিসেম্বর— ঢাকার সাভারের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী সাভার-আশুলিয়া এলাকা ছেড়ে পিছু হটে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটোর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শত্রুমুক্ত হয় সাভার। স্বাধীনতার ঠিক আগ মুহূর্তে তার রক্তে রঞ্জিত হয় এই জনপদের মাটি।

শহীদ গোলাম মোহাম্মদ দস্তগীর টিটো ছিলেন সাভারের সম্মুখসারির একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া মাত্র ১৬ বছরের টগবগে এই কিশোর মানিকগঞ্জের উত্তর শেওতা গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। তিনি সে সময় দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। অসীম সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ৮ ডিসেম্বর সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার ইয়ারপুর ইউনিয়নের তৈয়বপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান নেন টিটো এবং একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের বরাতে জানা যায়, ২ নম্বর সেক্টরের অধীন অর্ধশতাধিক গেরিলা যোদ্ধা আশুলিয়ার গাজীবাড়ী এলাকায় নেদুখাঁর বাড়িতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেন। সেখানে কয়েক শ নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে দেড় মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বে আশুলিয়ার তৈয়বপুর এলাকায় আরও একটি ক্যাম্প স্থাপিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইল থেকে পালিয়ে আসা শত্রুসেনারা সাভারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে। ১৪ ডিসেম্বর সকালে আশুলিয়ার ঘোষবাগ এলাকায় তারা অবস্থান নিলে মুক্তিযোদ্ধারা শ্রীগঙ্গা কাঁঠালবাগানে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় হানাদার বাহিনী পিছু হটতে শুরু করলে বিজয়ের উল্লাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে সামনে এগিয়ে যান কিশোর যোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটো। সহযোদ্ধাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় পাক বাহিনীর বুলেটে শহীদ হন তিনি। তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সাভার-আশুলিয়া পুরোপুরি হানাদারমুক্ত হয়।

শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা টিটোকে সমাহিত করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীত পাশে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসংলগ্ন ডেইরি গেট এলাকায়। প্রতি বছর দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদ টিটোর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় এবং তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া–মুনাজাত করে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাভার-আশুলিয়া এলাকায় পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার-আল বদর-আল শামস ব্যাপক নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। স্থানীয় শান্তি কমিটির সহযোগিতায় বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ সময় বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান।

১৪ ডিসেম্বরের যুদ্ধ ছাড়াও সাভারে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয়। মধুরআঁটি এলাকায় দিকভ্রান্ত পাকসেনার ওপর আক্রমণে নেতৃত্ব দেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও কাদের কমান্ডার। অন্যদিকে বিরুলিয়া ইউনিয়নের রুস্তমপুর এলাকায় আরেকটি সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেন মিরপুরের যোদ্ধারা। ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে শত্রুসেনারা পুরোপুরি ঢাকার দিকে পালিয়ে গেলে সাভার সম্পূর্ণ মুক্ত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সাভারে নির্মিত হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এ ছাড়া আছে ‘সংশপ্তক’, ‘অমর একুশে’ ও ‘বিজয় যাত্রা’ ভাস্কর্য। ডেইরি ফার্ম গেট এলাকায় রয়েছে শহীদ টিটোর স্মৃতিস্তম্ভ ‘টিটোর স্বাধীনতা’। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম ঘোষক আবুল কাশেম সন্দ্বীপের নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।

সাভারবাসী আজও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে শহীদ টিটোসহ সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে, যাদের আত্মত্যাগে ১৪ ডিসেম্বর সাভার পেলো স্বাধীনতার প্রথম আলো।