১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর। পবিত্র রমজান মাসের ২৩তম দিন। যে মাসে রক্তপাত ও হত্যা নিষিদ্ধ। চারদিক নিস্তব্ধ, শিশুরা ঘুমন্ত। রোজাদার মানুষজন সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু আজানের ধ্বনি শোনার আগেই হঠাৎ চারদিক বিদীর্ণ করে শুরু হয় শিলাবৃষ্টির মতো গুলি আর মর্টার শেলের গোলাবর্ষণ। সেহরির জন্য জেগে থাকা রোজাদার আর ঘুমন্ত মানুষ জেগে উঠে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন।
ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামের মানুষজন কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার ও আলবদর বাহিনী মিলে গ্রামের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। সঙ্গে চলতে থাকে লুটপাট ও নির্যাতন। ৭১’এর রমজানের সেই ভোররাতে এমনই চিত্র ছিল কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী হাতিয়া দাগারকুটি গ্রামসহ সাত গ্রামের।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, উলিপুর উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার দূরে হাতিয়া ইউনিয়নে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তিনটি কোম্পানি একত্রিত হয়ে হামলে পড়ে। অক্টোবরে ‘অপারেশন চিলমারীর’ প্রতিশোধ নিতে সেদিন সদর, উলিপুর ও চিলমারী থেকে হানাদার বাহিনী ত্রিমুখী অভিযান চালায়। প্রচলিত যুদ্ধনীতি কিংবা ইসলামের যুদ্ধনীতি কোনও কিছুর তোয়াক্কা করেনি হানাদার বাহিনী। সেদিন রমজানের পবিত্রতা, প্রশান্তি এবং আল্লাহর দেওয়া পুরস্কারের ঘোষণা সব ‘ভুল’ প্রমাণ করেছিল হানাদাররা। যেন শিকলমুক্ত শত শত ‘শয়তান’ হামলে পড়েছিল গ্রামবাসীর ওপর। রাজাকারদের সহায়তায় হাতিয়ার সাত গ্রামের ৬৯৭ জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নির্মম হত্যাযজ্ঞ রেহাই পায়নি মায়ের কোলের শিশুও।
পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতসহ ঝোপঝাড়ে পালিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন নিরীহ মানুষজন। অনেকে জীবন বাঁচাতে ঝাঁপ দেন ব্রহ্মপুত্র নদে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হানাদার বাহিনী রাজাকারদের সহযোগিতায় আত্মগোপন করা মানুষগুলোকে ধরে এনে দাগারকুটি এলাকায় জড়ো করে হাত-পা বেঁধে গুলি করে আর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেকের লাশও পুড়িয়ে দেয়।
সেহরির সময় থেকে শুরু হয়ে দিনব্যাপী চলা এই হত্যাযজ্ঞে আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায় হাতিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর, দাগারকুটি, হাতিয়া বকসি, রামখানা ও নয়াদাড়া গ্রামের শত শত বাড়িঘর। মুহূর্তেই ধ্বংস্তূপ আর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় উলিপুরের হাতিয়া দাগারকুটি এলাকার সাত গ্রাম।
উলিপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা তরুণ সংগঠক মারুফ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশন চিলমারীর কারণে হানাদার বাহিনী মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই অপারেশনের অন্যতম নেতৃত্বে থাকা খাইরুল আলম বাহিনী হাতিয়ার ভবেশ পালের পরিত্যক্ত বাড়িতে ক্যাম্প করে অপারেশন পরিচালনা করতেন। রাজাকাররা এই খবর হানাদার বাহিনীকে দিলে তারা প্রতিশোধ নিতে হাতিয়ায় আক্রমণ করে। তবে তাদের আকস্মিক আক্রমণ বিনা প্রতিরোধে হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। হাতিয়ার মন্ডলের হাটের কাছে আমতলায় হওয়া প্রতিরোধ যুদ্ধে হিতেন্দ্রনাথসহ পাঁচ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ হন অনেকে। পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হন। শেষে পাকিস্তানি বাহিনী চালায় গণহত্যা।’
মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গণের স্মৃতিচারণ নিয়ে রচিত উলিপুর উপজেলা প্রশাসনের ‘বিজয় কাব্য’ গ্রন্থে বীর মুক্তিযোদ্ধা মনছুর আলী বলেছেন, ‘১৯৭১-এর ১৩ নভেম্বর হাতিয়ায় নৃশংস গণহত্যা সংগঠিত হয়। নির্মম গণহত্যার পরিকল্পনাকারী ছিল পিচ কমিটির কিছু সদস্য। এরা পরিকল্পনা করে পাকিস্তানি বাহিনীর স্পেশাল টিম নিয়ে এসে হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা নিরীহ লোকদের ধরে নিয়ে এসে দাগারকুটিতে সারিবদ্ধ করে হত্যা করেছিল। তাদের অস্ত্রের সামনে প্রতিরোধ যুদ্ধে টিকতে না পেরে অধিনায়কের সংকেতে আমরা পিছুপা হই। মন্ডলের হাটে আমাদের পাঁচ বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।’
দাগারকুটি গ্রামেই ৬৯৭ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে গণকবর দেওয়া হয়। এই গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভ দুটোই ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু বিলীন হয়নি গ্রামবাসীর সেদিনের আত্মত্যাগের ইতিহাস। সেদিনের সেই গণহত্যা আর তার ভয়াবহতা আজও হাতিয়ার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষের আত্মত্যাগ।
গণকবরের স্থান ও স্মৃতিস্তম্ভ ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হওয়ার পর হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের কাছে আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মর্যাদা, তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, নতুন তৈরি স্মৃতিস্তম্ভে নামফলক স্থাপন এবং শহীদ পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে সরকারকে এগিয়ে আসার দাবি শহীদ পরিবারসহ এই এলাকার সাধারণ মানুষের।
রিপোর্টারের নাম 
























