আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত আলোচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম–খুন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও ছাত্ররাজনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। বুধবার (১০ ডিসেম্বর) আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, মানবাধিকার দিবস পালনের ৭৬ বছর পরও বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ–সংঘাত থামেনি। গাজাসহ বহু অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে।
তিনি বলেন, “মানবাধিকার দিবস মানলেই কি জীবন রক্ষা হয়? বাংলাদেশেও বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ।”
ফরহাদ দাবি করে বলেন, ৭১–এর পর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ হয়নি; গত ১৫ বছর ছিল মানবাধিকার সংকটের ভয়াবহ সময়। ব্যক্তি পর্যায় থেকে অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, ডাকসুর উদ্যোগে প্রথমবার অফিসিয়ালি মানবাধিকার দিবস পালিত হওয়া ইতিবাচক। অতীতে ছাত্র সংগঠনগুলোর নির্যাতনে শিক্ষার্থীর মৃত্যুও হয়েছে। র্যাবের হাতে তুলে দেওয়ার পর মোকাদ্দেস–মোকাদ্দেমসহ বহুজন নিখোঁজ হয়েছেন—এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না।
বেগম রোকেয়া পদক পাওয়া ড. নাবিলা ইদ্রীস গুম–ভুক্তভোগীদের শারীরিক–মানসিক নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অনেককে ইলেকট্রিক শক দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা পর্যন্ত নষ্ট করা হয়েছে।
গুমের শিকার ব্যারিস্টার আহমেদ বিন মীর কাশিম (আরমান) বলেন, “শত শত পরিবার জানে না তাদের প্রিয়জন জীবিত না মৃত—রাষ্ট্র জবাব দিতে ব্যর্থ। গুম একটি জাতীয় ক্ষত, আর এর প্রথম সমাধান কঠোর জবাবদিহিতা।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার কোটি ব্যয় হলেও গুম–ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তায় রাষ্ট্র কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার দেশত্যাগের ঘটনায় তদন্ত না হওয়াকে তিনি “রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি তোলেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের দপ্তরের মিশনপ্রধান (ভারপ্রাপ্ত) হুমা খান বলেন, মানবাধিকার কোনো পাশ্চাত্যের ধারণা নয়—সমতা, ন্যায়বিচার, সহানুভূতি ও সম্মান এদেশের সংস্কৃতিতেই নিহিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভালো আইন থাকলেও বাস্তবায়নের অভাব বড় সমস্যা।
প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর উপনিবেশিক মানসিকতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার কথা; কারণ জনগণের ট্যাক্সেই তাদের বেতন চলে।”
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০–এর গণআন্দোলন ও সাম্প্রতিক আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ “ফ্যাসিবাদী শাসনের” অধীনে ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছাত্রলীগ পরিচালিত “কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে” পরিণত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ইসলাম চর্চা বা নামাজ পড়ার অভিযোগে বহু শিক্ষার্থীকে শিবির সন্দেহে নির্যাতন করা হয়েছে। যারা মানবাধিকার কর্মীর নামে গুম–খুন ও দমননীতিকে বৈধতা দিয়েছেন, তাদের “জাতির শত্রু” অভিহিত করে বিচার দাবি করেন তিনি।
দীর্ঘ আলোচনায় বক্তারা গুম–খুনের অবসান, জবাবদিহিতা, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
বক্তারা ডাকসুর এই উদ্যোগকে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গুম–নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের আহ্বান জানান।
রিপোর্টারের নাম 

























