ঢাকা ০৮:২১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

শীতকালে অজু-গোসলের ৫টি অপরিহার্য মাসয়ালা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৩:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

শীতকালে ঠাণ্ডা পানি এবং আবহাওয়া অজু ও গোসলকে কষ্টকর করে তুললেও, ইসলামি শরিয়ত পবিত্রতার মৌলিক বিধানগুলোর পাশাপাশি এ সময়ের জন্য কিছু সহায়ক নিয়ম ও সুবিধা প্রদান করেছে। পবিত্রতা শুদ্ধ করার জন্য এই বিধানগুলো জানা জরুরি।

১. অজুর অঙ্গ পূর্ণভাবে ধৌত করা ফরজ (কোনো অংশ শুকনো রাখা যাবে না)

শীতকালে দ্রুত অজু করার প্রবণতা দেখা গেলেও, শরিয়তের মৌলিক বিধান হলো অজুর ফরজ অঙ্গসমূহ—মুখমণ্ডল, উভয় হাত কনুইসহ, মাথা মাসেহ ও উভয় পা টাখনুসহ—পূর্ণভাবে পানি দ্বারা ধৌত করা।

  • দলিল: আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) উচ্চ স্বরে বলেন, “সর্বনাশ! গোড়ালির নিম্নাংশগুলোর জন্য জাহান্নামের আগুন রয়েছে।” (বুখারি: ৯৬, মুসলিম: ২৪১)।
  • মাসয়ালা: এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট যে শীতকালেও প্রতিটি অঙ্গের সব অংশ ভালোভাবে ভেজাতে হবে; কোনো অংশ শুকনো থাকলে অজু শুদ্ধ হবে না।

২. তৈলাক্ত বা ক্রিমের স্তর পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় কি না যাচাই করা

শীতকালে ত্বক রক্ষায় ব্যবহৃত তেল, ক্রিম বা লোশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

  • মাসয়ালা: ইসলামি ফিকহের নিয়ম হলো, কোনো বস্তু যদি ত্বকের ওপর এমন স্তর তৈরি করে যার নিচে পানি প্রবেশ করতে পারে না (যেমন: জমাটবদ্ধ তেল, মলম বা মোম জাতীয় পদার্থ), তাহলে তা অপসারণ না করে অজু বা গোসল শুদ্ধ হবে না। আল্লামা ইবনে উসাইমিন (রহ.) তার ফতোয়াতুত তাহারাহ-তে এটিকে অপরিহার্য বলেছেন (পৃষ্ঠা: ১৭৪)।
  • ব্যতিক্রম: সাধারণ তেল (যেমন: অলিভ অয়েল, সরিষার তেল) বা তরল লোশন যা ত্বকের মধ্যে শুষে নেওয়া যায় এবং পানি প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে শুধু হাত বুলিয়ে নিশ্চিত করতে হবে যে পানি ত্বক স্পর্শ করেছে।

৩. প্রসাধনী ও রংয়ের স্তর সম্পর্কে সতর্কতা

নারীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রসাধনীর ব্যবহার অজুর সময় বিবেচনা করতে হবে।

  • যেসব ক্ষেত্রে বাধা নেই: মেহেদি, সুরমা, সাধারণ পাউডার বা আতর সাধারণত অজু-গোসলের পথে বাধা নয়, কারণ এগুলো ত্বকের রন্ধ্রে প্রবেশ করে বা পাতলা স্তর তৈরি করে। ইমাম কাসানি (রহ.) বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থে উল্লেখ করেন, যা ত্বকের সঙ্গে মিশে যায় এবং পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় না, তা অপসারণ করা জরুরি নয়।
  • যেসব ক্ষেত্রে বাধা আছে: আধুনিক কেমিক্যালযুক্ত নেইলপলিশ, লিপস্টিক, কৃত্রিম মেহেদি (যা ত্বকে আস্তরণ তৈরি করে) বা জেল জাতীয় প্রসাধনী অবশ্যই অপসারণ করতে হবে, কারণ এগুলো পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়। ফিকহি নিয়ম হলো: চামড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ, যেকোনো বস্তু তা প্রতিরোধ করলে তা দূর করা আবশ্যক।

৪. মাসেহ (মোজা মোছা) ও তায়াম্মুমের শরয়ি সুযোগ গ্রহণ

শীতকালে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে শরিয়ত প্রদত্ত কিছু ছাড় রয়েছে:

  • মোজা মাসেহ: পবিত্রতা অর্জনের পর মোটা ও পুরু উল/পশমের মোজা বা চামড়ার মোজা পরিধান করলে, পরবর্তী ২৪ ঘন্টা (মুকিমের জন্য) বা ৭২ ঘন্টা (মুসাফিরের জন্য) শুধু মোজার উপর তিন আঙুল দিয়ে মাসেহ করলেই পা ধৌত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
    • দলিল: হাদিসে বর্ণিত: “মুসাফির তিন দিন তিন রাত, আর মুকিম এক দিন এক রাত পর্যন্ত মোজা মোছে নিতে পারবে।” (তিরমিজি: ৯৯)।
  • তায়াম্মুম: যদি ঠাণ্ডা পানিতে অজু করলে রোগ বৃদ্ধি বা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে, অথবা পানি গরম করার কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তায়াম্মুম করার অনুমতি রয়েছে।
    • দলিল: আল্লাহ বলেন, “তোমরা যদি পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর।” (সুরা মায়িদা: ৬)।
    • সতর্কতা: তায়াম্মুম শুধু অজু বা গোসলের বিকল্প; নামাজের সময় সীমার মধ্যে পানি পাওয়া গেলে তা দিয়েই পবিত্রতা অর্জন করে নিতে হবে।

৫. গোসলের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন ও উষ্ণ পানি ব্যবহার

শীতকালে গোসলের সময় পুরো দেহে পানি পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

  • পানি পৌঁছানো: দীর্ঘ চুল বা ঘন দাড়ির নিচে পানি পৌঁছানো আবশ্যক। যদি চুল বা দাড়ি জটবদ্ধ হয়, তাহলে জট খুলে বা হাত দিয়ে চুল আলগা করে নিশ্চিত করতে হবে যে পানি ত্বকে পৌঁছেছে।
    • মাসয়ালা: ইমাম নববি (রহ.) আল-মাজমু গ্রন্থে বলেছেন, চুলের জটের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরজ নয়, যদি তা সাধারণভাবে খোলা না যায়; তবে বাহ্যিক অংশে পানি দিতে হবে।
  • উষ্ণ পানি: ঠাণ্ডা এড়ানোর জন্য উষ্ণ পানি ব্যবহার করা জায়েজ। তবে পানি গরম করার সামর্থ্য না থাকলে বা স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে দ্রুত কিন্তু পূর্ণ গোসল আদায় করতে হবে, যাতে কোনো ফরজ কাজ বাদ না পড়ে।

শীতের অসুবিধাকে অজুহাত না করে, অজুর অঙ্গ পূর্ণভাবে ধৌত করা, প্রসাধনী ও তেলের স্তর যাচাই করা, মাসেহ ও তায়াম্মুমের শরয়ি সুযোগ গ্রহণ এবং গোসলের সময় পানি পূর্ণভাবে পৌঁছানো নিশ্চিত করলে পবিত্রতা শুদ্ধ হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ফটিকছড়িতে গুলিতে যুবক নিহত: জামায়াত কর্মীর পরিচয় দাবি, থমথমে জনপদ, মেলেনি মামলা

শীতকালে অজু-গোসলের ৫টি অপরিহার্য মাসয়ালা

আপডেট সময় : ০৯:৪৩:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

শীতকালে ঠাণ্ডা পানি এবং আবহাওয়া অজু ও গোসলকে কষ্টকর করে তুললেও, ইসলামি শরিয়ত পবিত্রতার মৌলিক বিধানগুলোর পাশাপাশি এ সময়ের জন্য কিছু সহায়ক নিয়ম ও সুবিধা প্রদান করেছে। পবিত্রতা শুদ্ধ করার জন্য এই বিধানগুলো জানা জরুরি।

১. অজুর অঙ্গ পূর্ণভাবে ধৌত করা ফরজ (কোনো অংশ শুকনো রাখা যাবে না)

শীতকালে দ্রুত অজু করার প্রবণতা দেখা গেলেও, শরিয়তের মৌলিক বিধান হলো অজুর ফরজ অঙ্গসমূহ—মুখমণ্ডল, উভয় হাত কনুইসহ, মাথা মাসেহ ও উভয় পা টাখনুসহ—পূর্ণভাবে পানি দ্বারা ধৌত করা।

  • দলিল: আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) উচ্চ স্বরে বলেন, “সর্বনাশ! গোড়ালির নিম্নাংশগুলোর জন্য জাহান্নামের আগুন রয়েছে।” (বুখারি: ৯৬, মুসলিম: ২৪১)।
  • মাসয়ালা: এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট যে শীতকালেও প্রতিটি অঙ্গের সব অংশ ভালোভাবে ভেজাতে হবে; কোনো অংশ শুকনো থাকলে অজু শুদ্ধ হবে না।

২. তৈলাক্ত বা ক্রিমের স্তর পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় কি না যাচাই করা

শীতকালে ত্বক রক্ষায় ব্যবহৃত তেল, ক্রিম বা লোশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

  • মাসয়ালা: ইসলামি ফিকহের নিয়ম হলো, কোনো বস্তু যদি ত্বকের ওপর এমন স্তর তৈরি করে যার নিচে পানি প্রবেশ করতে পারে না (যেমন: জমাটবদ্ধ তেল, মলম বা মোম জাতীয় পদার্থ), তাহলে তা অপসারণ না করে অজু বা গোসল শুদ্ধ হবে না। আল্লামা ইবনে উসাইমিন (রহ.) তার ফতোয়াতুত তাহারাহ-তে এটিকে অপরিহার্য বলেছেন (পৃষ্ঠা: ১৭৪)।
  • ব্যতিক্রম: সাধারণ তেল (যেমন: অলিভ অয়েল, সরিষার তেল) বা তরল লোশন যা ত্বকের মধ্যে শুষে নেওয়া যায় এবং পানি প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে শুধু হাত বুলিয়ে নিশ্চিত করতে হবে যে পানি ত্বক স্পর্শ করেছে।

৩. প্রসাধনী ও রংয়ের স্তর সম্পর্কে সতর্কতা

নারীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রসাধনীর ব্যবহার অজুর সময় বিবেচনা করতে হবে।

  • যেসব ক্ষেত্রে বাধা নেই: মেহেদি, সুরমা, সাধারণ পাউডার বা আতর সাধারণত অজু-গোসলের পথে বাধা নয়, কারণ এগুলো ত্বকের রন্ধ্রে প্রবেশ করে বা পাতলা স্তর তৈরি করে। ইমাম কাসানি (রহ.) বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থে উল্লেখ করেন, যা ত্বকের সঙ্গে মিশে যায় এবং পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় না, তা অপসারণ করা জরুরি নয়।
  • যেসব ক্ষেত্রে বাধা আছে: আধুনিক কেমিক্যালযুক্ত নেইলপলিশ, লিপস্টিক, কৃত্রিম মেহেদি (যা ত্বকে আস্তরণ তৈরি করে) বা জেল জাতীয় প্রসাধনী অবশ্যই অপসারণ করতে হবে, কারণ এগুলো পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়। ফিকহি নিয়ম হলো: চামড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ, যেকোনো বস্তু তা প্রতিরোধ করলে তা দূর করা আবশ্যক।

৪. মাসেহ (মোজা মোছা) ও তায়াম্মুমের শরয়ি সুযোগ গ্রহণ

শীতকালে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে শরিয়ত প্রদত্ত কিছু ছাড় রয়েছে:

  • মোজা মাসেহ: পবিত্রতা অর্জনের পর মোটা ও পুরু উল/পশমের মোজা বা চামড়ার মোজা পরিধান করলে, পরবর্তী ২৪ ঘন্টা (মুকিমের জন্য) বা ৭২ ঘন্টা (মুসাফিরের জন্য) শুধু মোজার উপর তিন আঙুল দিয়ে মাসেহ করলেই পা ধৌত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
    • দলিল: হাদিসে বর্ণিত: “মুসাফির তিন দিন তিন রাত, আর মুকিম এক দিন এক রাত পর্যন্ত মোজা মোছে নিতে পারবে।” (তিরমিজি: ৯৯)।
  • তায়াম্মুম: যদি ঠাণ্ডা পানিতে অজু করলে রোগ বৃদ্ধি বা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে, অথবা পানি গরম করার কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তায়াম্মুম করার অনুমতি রয়েছে।
    • দলিল: আল্লাহ বলেন, “তোমরা যদি পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর।” (সুরা মায়িদা: ৬)।
    • সতর্কতা: তায়াম্মুম শুধু অজু বা গোসলের বিকল্প; নামাজের সময় সীমার মধ্যে পানি পাওয়া গেলে তা দিয়েই পবিত্রতা অর্জন করে নিতে হবে।

৫. গোসলের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন ও উষ্ণ পানি ব্যবহার

শীতকালে গোসলের সময় পুরো দেহে পানি পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

  • পানি পৌঁছানো: দীর্ঘ চুল বা ঘন দাড়ির নিচে পানি পৌঁছানো আবশ্যক। যদি চুল বা দাড়ি জটবদ্ধ হয়, তাহলে জট খুলে বা হাত দিয়ে চুল আলগা করে নিশ্চিত করতে হবে যে পানি ত্বকে পৌঁছেছে।
    • মাসয়ালা: ইমাম নববি (রহ.) আল-মাজমু গ্রন্থে বলেছেন, চুলের জটের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরজ নয়, যদি তা সাধারণভাবে খোলা না যায়; তবে বাহ্যিক অংশে পানি দিতে হবে।
  • উষ্ণ পানি: ঠাণ্ডা এড়ানোর জন্য উষ্ণ পানি ব্যবহার করা জায়েজ। তবে পানি গরম করার সামর্থ্য না থাকলে বা স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে দ্রুত কিন্তু পূর্ণ গোসল আদায় করতে হবে, যাতে কোনো ফরজ কাজ বাদ না পড়ে।

শীতের অসুবিধাকে অজুহাত না করে, অজুর অঙ্গ পূর্ণভাবে ধৌত করা, প্রসাধনী ও তেলের স্তর যাচাই করা, মাসেহ ও তায়াম্মুমের শরয়ি সুযোগ গ্রহণ এবং গোসলের সময় পানি পূর্ণভাবে পৌঁছানো নিশ্চিত করলে পবিত্রতা শুদ্ধ হবে।