মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ১২:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬

মুদ্রাস্ফীতির দুষ্টচক্রে অর্থনীতি: সরকারি নীতি ও বাস্তবতার ফারাক

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির একাধিক আঘাতের সম্মুখীন। সরকারের সুদের হার কমানো, হাইপাওয়ার্ড মানি সাপ্লাই বৃদ্ধি এবং নাগরিক পর্যায়ে নগদ টাকার সরবরাহ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বন্যাজনিত কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি। ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কারণগুলোও এই মুদ্রাস্ফীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের সর্বোচ্চ ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা জুনে কিছুটা কমে ৯.১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে, চলমান বন্যা পরিস্থিতি জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের ঘোষিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ৭.৫ শতাংশ, সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সরকার পলিসি রেট (রেপো) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯.৫ শতাংশে এবং স্ট্যান্ডার্ড লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা সুদের গড় উচ্চসীমা ১১.৫ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে নামিয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়াতে চাইছে। তাত্ত্বিকভাবে, সুদের হার কমানোর ফলে ঋণের চাহিদা বাড়ার কথা, কিন্তু এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বাস্তবে, স্ট্যান্ডার্ড লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা সুদের গড় উচ্চসীমা বাস্তবে ১১.৯৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি। এছাড়াও, সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট মনিটারি পলিসি মডেলিং ছাড়াই একদিনের নোটিশে স্প্রেডের লক্ষ্যমাত্রা ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যেখানে বাস্তবে স্প্রেড ৫.৭২ শতাংশ।

স্প্রেড গণনার সময় শ্রেণীকৃত ঋণের বিদ্যমান সুদের হার বিবেচনায় নেওয়া হলেও, অনেক ঋণ থেকে আয় প্রায় শূন্য বা অনুল্লেখযোগ্য। এসএমইসহ কিছু লেন্ডিং প্রোডাক্টে সুদের হার অনেক বেশি। তাই খাতভিত্তিক ও প্রোডাক্টভিত্তিক (যেমন—এসএমই, করপোরেট, পার্সোনাল লোন ইত্যাদি) স্প্রেডের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে তা বাস্তবায়ন সহজ হবে। বর্তমানে সামগ্রিক (ওভারঅল) স্প্রেডের একক লক্ষ্যমাত্রা কার্যকরভাবে কাজ করছে না।

প্রশ্ন উঠছে, সুদের হার কমানোর ফলে যে বাড়তি ঋণ চাহিদা তৈরি হবে, সেই অর্থের যোগান কোথা থেকে আসবে? এছাড়াও, ব্যাংকের ওপর আস্থাহীনতার কারণে নগদায়ন বাড়ছে, যা রিজার্ভ মানি হিসেবে গণ্য হয়। প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা নগদ টাকা বৃদ্ধি বা আমানত কমে যাওয়া মূল্যস্ফীতির জন্য অনুকূল। সরকার নিজেও ব্যাংক থেকে ধার করা বাড়িয়েছে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোতে তারল্য সরবরাহ করছে, যা পরোক্ষভাবে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বৃদ্ধি করছে এবং মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অভিবাসন নীতিতে ট্রাম্পের ওপর মার্কিন জনআস্থার বড় ধস

মুদ্রাস্ফীতির দুষ্টচক্রে অর্থনীতি: সরকারি নীতি ও বাস্তবতার ফারাক

আপডেট সময় : ১০:৩২:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির একাধিক আঘাতের সম্মুখীন। সরকারের সুদের হার কমানো, হাইপাওয়ার্ড মানি সাপ্লাই বৃদ্ধি এবং নাগরিক পর্যায়ে নগদ টাকার সরবরাহ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বন্যাজনিত কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি। ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কারণগুলোও এই মুদ্রাস্ফীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের সর্বোচ্চ ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা জুনে কিছুটা কমে ৯.১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে, চলমান বন্যা পরিস্থিতি জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের ঘোষিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ৭.৫ শতাংশ, সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সরকার পলিসি রেট (রেপো) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯.৫ শতাংশে এবং স্ট্যান্ডার্ড লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা সুদের গড় উচ্চসীমা ১১.৫ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে নামিয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়াতে চাইছে। তাত্ত্বিকভাবে, সুদের হার কমানোর ফলে ঋণের চাহিদা বাড়ার কথা, কিন্তু এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বাস্তবে, স্ট্যান্ডার্ড লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা সুদের গড় উচ্চসীমা বাস্তবে ১১.৯৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি। এছাড়াও, সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট মনিটারি পলিসি মডেলিং ছাড়াই একদিনের নোটিশে স্প্রেডের লক্ষ্যমাত্রা ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যেখানে বাস্তবে স্প্রেড ৫.৭২ শতাংশ।

স্প্রেড গণনার সময় শ্রেণীকৃত ঋণের বিদ্যমান সুদের হার বিবেচনায় নেওয়া হলেও, অনেক ঋণ থেকে আয় প্রায় শূন্য বা অনুল্লেখযোগ্য। এসএমইসহ কিছু লেন্ডিং প্রোডাক্টে সুদের হার অনেক বেশি। তাই খাতভিত্তিক ও প্রোডাক্টভিত্তিক (যেমন—এসএমই, করপোরেট, পার্সোনাল লোন ইত্যাদি) স্প্রেডের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে তা বাস্তবায়ন সহজ হবে। বর্তমানে সামগ্রিক (ওভারঅল) স্প্রেডের একক লক্ষ্যমাত্রা কার্যকরভাবে কাজ করছে না।

প্রশ্ন উঠছে, সুদের হার কমানোর ফলে যে বাড়তি ঋণ চাহিদা তৈরি হবে, সেই অর্থের যোগান কোথা থেকে আসবে? এছাড়াও, ব্যাংকের ওপর আস্থাহীনতার কারণে নগদায়ন বাড়ছে, যা রিজার্ভ মানি হিসেবে গণ্য হয়। প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা নগদ টাকা বৃদ্ধি বা আমানত কমে যাওয়া মূল্যস্ফীতির জন্য অনুকূল। সরকার নিজেও ব্যাংক থেকে ধার করা বাড়িয়েছে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোতে তারল্য সরবরাহ করছে, যা পরোক্ষভাবে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বৃদ্ধি করছে এবং মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে।