ঢাকা ০১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

. কৌশলী ফাঁদ বনাম কৌশলগত নীরবতা: জুলাই আন্দোলনে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের রাজনীতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩৩:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের জুলাই মাস। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া একটি সাধারণ আন্দোলন অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমগ্র দেশব্যাপী সরকারবিরোধী সর্বাত্মক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের শুরুর দিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টিকে একটি সীমিত পরিসরের ছাত্র আন্দোলন হিসেবে গণ্য করলেও, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘাত, ক্ষয়ক্ষতি, হতাহতের ঘটনা, গণগ্রেপ্তার এবং ছাত্র-জনতার ক্ষোভের আগুনে ক্ষমতার ভিত প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই দাবি তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের অনমনীয় ‘এক দফা’ দাবিতে পরিণত হয়।

এমনই এক চরম উত্তপ্ত ও সংকটময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর ঠিক দুই দিন আগে, ২৯ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ নেতারা জানান, দেশব্যাপী সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে এই দুই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন সরকারের এই পদক্ষেপটি রাজনৈতিকভাবে চরম ‘মিসক্যালকুলেশন’ বা ভুল হিসাব ছিল, যা মূলত আন্দোলনের আগুনকে আরও উসকে দিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকার যখন আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, ঠিক তখনই জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার কার্ডটি খেলেছিল। সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল আন্দোলন থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া এবং এটিকে একটি উগ্রবাদী রাজনৈতিক সসংঘাত হিসেবে চিত্রায়িত করা। এর মাধ্যমে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নামলে আন্দোলনটিকে সহিসংস রাজনৈতিক রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে কঠোর হস্তে দমন করার আইনি ও রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতো। তবে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্ব সচেতনভাবেই সরকারের পাতা সেই ফাঁদে পা দেয়নি।

দলীয় সূত্র ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিষিদ্ধ করার পর জামায়াতে ইসলামী কোনো ধরনের একক দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকে। বরং তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের একক পরিচয় প্রকাশ না করে সাধারণ ছাত্র-জনতার কাতারে থেকে আন্দোলন সফল করার আহ্বান জানায়। দলটির নীতি-নির্ধারকদের ভাষ্যমতে, তারা এই নিষিদ্ধকরণকে কেন্দ্র করে মূল আন্দোলন থেকে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাননি। ফলে সরকারের গণবিচ্ছিন্ন করার কৌশলটি কার্যকর হতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঘটনাটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং অর্গানিক গণঅভ্যুত্থান, যেখানে সকল শ্রেণীর আপামর জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। তৎকালীন সরকার এই গণজাগরণকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে মস্ত বড় ভুল করেছিল। ফলে এই নিষেধাজ্ঞার কারণে জনরোষ কমার বদলে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও ছাত্র হত্যার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় দেশের সাধারণ মানুষ আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠকের পরেই তেহরানের কৌশলগত পরিবর্তন, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

. কৌশলী ফাঁদ বনাম কৌশলগত নীরবতা: জুলাই আন্দোলনে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের রাজনীতি

আপডেট সময় : ১১:৩৩:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই মাস। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া একটি সাধারণ আন্দোলন অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমগ্র দেশব্যাপী সরকারবিরোধী সর্বাত্মক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের শুরুর দিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টিকে একটি সীমিত পরিসরের ছাত্র আন্দোলন হিসেবে গণ্য করলেও, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘাত, ক্ষয়ক্ষতি, হতাহতের ঘটনা, গণগ্রেপ্তার এবং ছাত্র-জনতার ক্ষোভের আগুনে ক্ষমতার ভিত প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই দাবি তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের অনমনীয় ‘এক দফা’ দাবিতে পরিণত হয়।

এমনই এক চরম উত্তপ্ত ও সংকটময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর ঠিক দুই দিন আগে, ২৯ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ নেতারা জানান, দেশব্যাপী সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে এই দুই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন সরকারের এই পদক্ষেপটি রাজনৈতিকভাবে চরম ‘মিসক্যালকুলেশন’ বা ভুল হিসাব ছিল, যা মূলত আন্দোলনের আগুনকে আরও উসকে দিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকার যখন আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, ঠিক তখনই জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার কার্ডটি খেলেছিল। সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল আন্দোলন থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া এবং এটিকে একটি উগ্রবাদী রাজনৈতিক সসংঘাত হিসেবে চিত্রায়িত করা। এর মাধ্যমে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নামলে আন্দোলনটিকে সহিসংস রাজনৈতিক রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে কঠোর হস্তে দমন করার আইনি ও রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতো। তবে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্ব সচেতনভাবেই সরকারের পাতা সেই ফাঁদে পা দেয়নি।

দলীয় সূত্র ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিষিদ্ধ করার পর জামায়াতে ইসলামী কোনো ধরনের একক দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকে। বরং তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের একক পরিচয় প্রকাশ না করে সাধারণ ছাত্র-জনতার কাতারে থেকে আন্দোলন সফল করার আহ্বান জানায়। দলটির নীতি-নির্ধারকদের ভাষ্যমতে, তারা এই নিষিদ্ধকরণকে কেন্দ্র করে মূল আন্দোলন থেকে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাননি। ফলে সরকারের গণবিচ্ছিন্ন করার কৌশলটি কার্যকর হতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঘটনাটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং অর্গানিক গণঅভ্যুত্থান, যেখানে সকল শ্রেণীর আপামর জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। তৎকালীন সরকার এই গণজাগরণকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে মস্ত বড় ভুল করেছিল। ফলে এই নিষেধাজ্ঞার কারণে জনরোষ কমার বদলে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও ছাত্র হত্যার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় দেশের সাধারণ মানুষ আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে।