চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের প্রাণ হিসেবে পরিচিত সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কর্ণফুলী ও হালদা নদীগুলো বর্তমানে স্থানীয় মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বর্ষায় এই নদীগুলো দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং বছরের পর বছর খননের অভাবে তাদের স্বাভাবিক পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা ভারতের উজানের ঢলেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে, যা লাখ লাখ মানুষকে পানিবন্দি করে ফেলছে এবং ফসল ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি করছে। যে সকল প্রতিষ্ঠান এই নদীগুলো রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
চলতি জুলাই মাসে টানা ভারী বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে আসা ঢলের কারণে দেশের ছয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বান্দরবানে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলা প্রশাসনকে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে হয়েছিল। এই বন্যায় শুধুমাত্র চট্টগ্রামে চার শিশুসহ ৫৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া অঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল আরও উদ্বেগজনক। জুলাই মাসের শুরুতে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা যায় সড়ক, সেতু ও বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের অভিযোগ, মাতামুহুরীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব প্রতি বছর তাদের এই দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজার ও বান্দরবানের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরী নদী একসময় খরস্রোতা ছিল। কিন্তু গত এক দশকে দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ এবং পলি জমে নদীটি মারাত্মক নাব্য সংকটে পড়েছে। ১৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি বর্তমানে দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে তার গভীরতা হারিয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সেচ সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে মাছের অভয়াশ্রম ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ড্রেজিং প্রকল্প আট বছর ধরে বন্ধ থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।
বান্দরবান হয়ে প্রবাহিত ২৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সাঙ্গু নদীও কর্ণফুলীর মতোই দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত। পাহাড়ি অঞ্চলের নদী হওয়ায় ভারী বৃষ্টিতে সাঙ্গুতে দ্রুত ঢল নামে। কিন্তু নাব্য কমে যাওয়ায় সেই পানি দ্রুত সাগরে নামতে পারছে না, যা বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
রিপোর্টারের নাম 



















