পাবনা শহরের সাধুপাড়া এলাকার অন্যতম পরিচিত হোসিয়ারি ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি বেশ বড় মাপের হোসিয়ারি কারখানা। তাঁর সেই কারখানায় কাজ করে প্রায় ৪০০ জন সাধারণ মানুষের জীবিকার সংস্থান হয়েছিল। উৎপাদিত উন্নতমানের হোসিয়ারি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে তিনি ভালো আয়ও করছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে ভারতে পণ্য রপ্তানি ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে চরম বিপাকে পড়েন তিনি। কারখানায় উৎপাদিত পণ্য ভারতের বাজারে বিক্রি বা পাঠাতে না পেরে একপর্যায়ে লোকসান গুনে কারখানাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন আরিফ হোসেন। ফলে তিনি দেনার দায়ে নিঃস্ব ও দেউলিয়া হয়ে পড়েন এবং একই সাথে কর্মহীন হয়ে পড়েন কারখানার প্রায় ৪০০ সাধারণ শ্রমিক।
উদ্যোক্তা আরিফ হোসেনের মতো একই ধরনের চরম সংকটে পড়েছেন পাবনার অসংখ্য ছোট-বড় হোসিয়ারি ব্যবসায়ী ও কারখানা মালিক। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্যমতে, পাবনা জেলাজুড়ে গড়ে ওঠা প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানায় একসময় লক্ষাধিক শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন। তবে ভারতে স্থলপথে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে জেলাটির প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমিক এখন পুরোপুরি বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দিনদিন সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় একের পর এক কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের সম্মানিত সভাপতি সেলিম সরদার প্রথম আলোকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত হোসিয়ারি পণ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশই একসময় কেবল পাবনা থেকেই বিদেশে রপ্তানি হতো। তবে বর্তমান অচলাবস্থার কারণে প্রতিদিন পাওনাদার ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে কারখানার মালিকদের অপ্রীতিকর বিরোধ তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে পাবনার এই খাতের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং হাজার হাজার মালিক-শ্রমিককে রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো অত্যন্ত জরুরি।
পাবনার হোসিয়ারিশিল্পের ২০০ বছরের চড়াই-উতরাই: পাবনার প্রবীণ ও অভিজ্ঞ হোসিয়ারি ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পাবনা অঞ্চলে এই শিল্পটির গোড়াপত্তন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে। সে সময় পাবনা শহরের ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত ইছামতী নদীর জলপথকে কাজে লাগিয়ে কাঁচামাল ও পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা হতো। তৎকালীন ধনাঢ্য হিন্দু ও মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে সরাসরি উন্নত মানের সুতা আমদানি করতেন এবং পরবর্তীতে নিজেদের কারখানায় তৈরি সুতা দিয়ে গেঞ্জি উৎপাদন করতেন। পাবনায় তৈরি সেই উন্নত মানের সুতার গেঞ্জি খুব দ্রুতই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ব্যাপক পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করে।
তবে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পর সেই মাড়োয়ারি ও হিন্দু ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ পাবনা ছেড়ে ভারতে চলে যান, যার ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিল্পটিতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। দেশভাগের পর ধীরে ধীরে এই সম্ভাবনাময় শিল্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে আসে স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ীদের হাতে। তাঁরা নানা প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে স্বাধীনতার পরপরই অর্থাৎ ১৯৭২ সালের দিকে কাঁচামাল সংকটসহ নানা কারণে শিল্পটি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে। পরবর্তীতে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৯০ সালের দিকে সুতার গেঞ্জি তৈরির সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে তৈরি পোশাক কারখানার ফেলে দেওয়া ‘ঝুট’ কাপড়ের গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটারসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক পোশাক উৎপাদন শুরু হয়। এর ফলে পাবনায় এই শিল্পের পরিধি ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ভারতে স্থলপথে রপ্তানির পাশাপাশি মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে এসব ঝুট কাপড়ের পণ্য সুনামের সাথে রপ্তানি হতে থাকে।
স্থলপথে রপ্তানি বন্ধের পর তৈরি হওয়া গভীর সংকট: পাবনার কারখানামালিকেরা জানান, পূর্বে সরাসরি ট্রাকযোগে স্থলপথের সীমান্ত ব্যবহার করে অত্যন্ত সহজে ভারতে তাঁদের হোসিয়ারি পণ্য রপ্তানি করা হতো। সে সময় প্রতি সপ্তাহে শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক পাবনা থেকে ভারতে যেত, যার মাধ্যমে সপ্তাহে দেড় থেকে দুই লাখ মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। তবে ভারতের সাথে স্থলপথের সেই বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখন সপ্তাহে মাত্র সাত থেকে আট ট্রাক পণ্য বিকল্প হিসেবে নৌপথে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর ঘুরে জলপথে পণ্য পাঠাতে একদিকে পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সমুদ্রপথে রপ্তানি করা পণ্যের বিক্রয়মূল্য হাতে পেতে এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ফলে সব দিক মিলিয়ে পাবনার উদ্যোক্তাদের প্রতিনিয়ত বিপুল আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে।
পাবনা শহরতলির দ্বীপচর এলাকার হোসিয়ারি ব্যবসায়ী মিরাজুল ইসলাম ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বড় বড় গার্মেন্টস থেকে ঝুট কাপড় কিনে এনে গেঞ্জি, সোয়েটার, মোজাসহ নানা ধরনের পোশাক তৈরি করে ভারত, মালয়েশিয়া, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি রপ্তানি করতেন। তিনি জানান, তাঁদের কারখানায় উৎপাদিত মোট পণ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মূলত ভারতে রপ্তানি করা হতো। স্বাভাবিক সময়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২৫ লাখ টাকার হোসিয়ারি পণ্য ভারতে যেত এবং তাঁর কারখানায় শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছিল। কিন্তু স্থলপথে রপ্তানি বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার পর থেকে এখন তাঁর কোনো আয়-রোজগার নেই। তদুপরি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা নিয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
একইভাবে পাবনা শহরের সাধুপাড়া মহল্লার ‘এসবি রয়েল গার্মেন্টসের’ ব্যবস্থাপক মো. আশিক হোসেন জানান, ‘স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের পিঠ পুরোপুরি দেয়ালে ঠেকে গেছে। আগে কাজের এত চাপ ছিল যে দম ফেলার সময় পাওয়া যেত না। কারখানায় প্রায় ৩০ জন কর্মী শুধু কাটিংয়ের কাজ করতেন, আর এখন বাধ্য হয়ে কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে মাত্র সাতজনে আনা হয়েছে। কাজ না থাকায় আমরা এখন শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছি।’
সরেজমিনে পাবনার হোসিয়ারি পল্লির একদিন: সম্প্রতি পাবনা শহরের সাধুপাড়া, বাংলাবাজার, দিলালপুরসহ বিভিন্ন হোসিয়ারি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শহরের প্রাণকেন্দ্রের পাশাপাশি গ্রামগঞ্জের পাড়া-মহল্লাতেও ছোট-বড় অনেক ঝুট কাপড়ভিত্তিক কারখানা গড়ে উঠেছে। কোনো কারখানায় কাটিংয়ের কাজ চলছে, আবার কোথাও চলছে সেলাইয়ের কাজ। তবে কর্মরত কারিগর ও মালিকদের সাথে আলাপকালে তাঁদের অধিকাংশের চোখেমুখেই চরম হতাশা ও উদ্বেগের স্পষ্ট ছাপ লক্ষ করা গেছে। কারখানাগুলোর নিজস্ব গুদাম ও শোরুমে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত পণ্য আটকা পড়ে আছে। এছাড়া বস্তায় ভরা হাজার হাজার টাকার ঝুট কাপড় অব্যবহৃত অবস্থায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। অধিকাংশ কারখানাতেই অর্ধেকের বেশি শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। আর যাঁরা এখনো কাজে টিকিয়া আছেন, তাঁদের কাজের মধ্যেও আগের সেই ব্যস্ততা ও প্রাণচাঞ্চল্য নেই।
সাধুপাড়া ঝুটপল্লির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের তৈরি পোশাক কারখানা থেকে ঝুট কাপড় সংগ্রহ করে এনে পাবনার কারখানামালিকদের কাছে বিক্রি করতেন। একসময় চাহিদা এত বেশি ছিল যে কাপড় সরবরাহ করে কুলিয়ে উঠতে পারতেন না। কিন্তু গত প্রায় দেড় বছর ধরে বাজারে কোনো বিক্রি নেই। গুদামভর্তি কাঁচামাল নিয়ে তিনি প্রতিদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকেন। আগে তাঁর গুদামে কাপড় বাছাইয়ের কাজের জন্য ১৫ জন কর্মী কর্মরত ছিলেন, কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে ১০ জন কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়েছে।
একই এলাকার অপর ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান, পাবনার ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীই ব্যাংক কিংবা এনজিও থেকে সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চেয়ে বিদেশের বাজারে পণ্যের দাম ও চাহিদা দুটোই ভালো ছিল। কিন্তু ভারতের সাথে স্থলপথে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই খাতের সবাই এখন এক বিরাট অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন শ্রমিকেরা: সাধুপাড়া এলাকার আফজাল হোসেন নামের একজন সাধারণ শ্রমিক জানান, কিছুদিন আগে তিনি কারখানার কাজ হারিয়েছেন এবং বর্তমানে পরিবার বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে অন্য যেকোনো কাজের সন্ধান করছেন।
অন্যদিকে জনি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান জানান, আগে স্থলপথে ভারতে পণ্য পাঠালে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন দিন সময় লাগত এবং মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই পণ্যের পূর্ণ টাকা হাতে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন নৌপথে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পণ্য পাঠাতে সময় লাগছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন। আর বিক্রির টাকা ফেরত আসছে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর। ফলে মূলধন আটকে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে অল্প পরিমাণ পণ্য নৌপথে পাঠানো হচ্ছে। তাঁদের মালিকানাধীন কয়েকটি কারখানায় আগে প্রায় ৫০০ শ্রমিক কাজ করতেন, যা সংকট বাড়ার কারণে কমে এখন মাত্র ২০০ জনে নেমে এসেছে।
পাবনা জেলার সবচেয়ে বড় হোসিয়ারি পণ্য বিক্রয় কেন্দ্র ‘এ আর কর্নারে’ উৎপাদিত কাপড়ে বিভিন্ন নকশার ছাপ দেওয়ার কাজ করতেন তরুণ দাস। তিনি অত্যন্ত কষ্টের সাথে জানান, রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর থেকে তাঁর হাতে একদম কাজ নেই বললেই চলে। বেকার বসে দিন কাটাতে হচ্ছে। ঘরে তাঁর স্ত্রী মারাত্মক অসুস্থ, কিন্তু কাজের আয় না থাকায় চিকিৎসার ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে পারছেন না। ফলে দুই সন্তান ও অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিদিন সংসার চালানোই তাঁর জন্য এক কঠিন যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাবনার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প সংকট প্রসঙ্গে পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের অন্যতম পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হোসিয়ারিশিল্প হলো পাবনার নিজস্ব ঐতিহ্য ও প্রাণ। মূলত এই শিল্পটি দিয়েই দেশজুড়ে পাবনা জেলার আলাদা পরিচিতি গড়ে উঠেছিল। ভৌগোলিক বিচারে এই শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ও সম্ভাবনার সুযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমানে ভুল নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জটিলতায় এটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এই সংকট কাটাতে হলে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। পাবনার ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে বাঁচাতে অবিলম্বে ভারতের সাথে বন্ধ থাকা স্থলপথের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পুনরার চালু করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রিপোর্টারের নাম 























