ঢাকা ০৬:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দোরগোড়ায় দিল্লির নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২০:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে গত সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) হাজার হাজার ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী একযোগে জড়ো হন। রাজধানীজুড়ে তাঁদের এমন আকস্মিক ও বিশাল উপস্থিতিতে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ও অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মীরা রীতিমতো হতবাক ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

ঘটনাস্থলে কয়েক স্তরের কঠোর ব্যারিকেড নির্মাণ, তিন হাজারের মতো সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং দ্রুত তথ্য ছড়ানো রোধে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরও সেখানে নজিরবিহীন এই ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনাটি ঘটে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ তরুণদের বিশালাকার এই আন্দোলনকারী জনস্রোত একপর্যায়ে ভারতের সংসদ ভবনের একেবারে দোরগোড়াতেও পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে উপর্যুপরি কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে এবং তীব্র লাঠিপেটা করে।

দ্য হিন্দু পত্রিকার একজন সরেজমিন প্রতিবেদক জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো একক শীর্ষ নেতৃত্ব ছাড়াই অর্থাৎ একপ্রকার ‘নেতৃত্বহীন’ এই বিশালাকার বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তর এলাকা থেকে রাইসিনা মার্গ হয়ে সরাসরি সংসদ ভবনের দিকে দ্রুমে এগিয়ে যান। এ সময় প্রথম দিকে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাঁদের পথ রোধে তেমন কোনো বাধা প্রদান করতে পারেনি। সংসদের দিকে যাওয়ার প্রতিটি প্রধান রাস্তা তখন শুধুই সাধারণ আন্দোলনকারী ও বিক্ষোভকারীতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল। উল্লেখযোগ্য যে, গতকাল থেকেই ভারতের সংসদে গুরুত্বর্পূর্ণ বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঠিক এই দিনটিকেই বেছে নিয়ে আন্দোলনকারীরা পুলিশের প্রস্তুত করা প্রতিটি নিরাপত্তা ব্যারিকেড একের পর এক ভেঙে সংসদের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে একপর্যায়ে সংসদ প্রাঙ্গণ থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে বড় বড় বাস আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে পুলিশ ব্যারিকেড সৃষ্টি করে তাঁদের আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

সম্প্রতি সমগ্র ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করা বিতর্কিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সর্বাত্মক ফাঁসের প্রতিবাদেই মূলত এই মহাসংগ্রাম ও বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে। আর এর জের ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে সরাসরি সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের চরম ডাক দেয় তরুণদের অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। মূলত তাদের সেই আহ্বানে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েই সারা দেশ থেকে এই বিশাল জনতা দিল্লিতে এসে একযোগে জড়ো হয়েছিল।

এর আগে এই নিট পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে এবং শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে যন্তর মন্তর প্রাঙ্গণে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন বিশিষ্ট সামাজিক অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তবে গত ১৮ জুলাই ভোরে অনশনস্থল থেকে পুলিশ তাঁকে জোরপূর্বক চক্রান্ত করে তুলে নিয়ে যায়। টানা ২০ দিন ধরে সেখানে তিনি অনশন পালন করছিলেন। সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ কর্তৃক এভাবে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি বিক্ষোভে নতুন মাত্রা ও দাবানল যোগ করে। তাঁর এই নিগ্রহের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে পরবর্তীতে শত শত সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করেন।

দিল্লির রাজপথের এমন জোরালো বিক্ষোভের উত্তাপ রাজপথ ছাড়িয়ে সংসদের ভেতরেও চরমভাবে অনুভূত হয়। এনডিএ সরকারের জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী মন্ত্রীরা দফায় দফায় সংসদ ভবনের ভেতরে রুদ্ধদ্বার জরুরি বৈঠকে বসেন। এর মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিতর্কিত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক টানা প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলে।

জোরালো হচ্ছে বিক্ষোভ, বাধ্য হয়ে নমনীয় কেন্দ্রীয় সরকার: গত রোববার সন্ধ্যায় ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রগুলো দিল্লি সরকারকে আগাম বার্তা দিয়ে জানায় যে, যন্তর মন্তর বিক্ষোভস্থলে দ্রুত লোকসমাগম বৃদ্ধি পাচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের পাওয়ার পর পরই নয়াদিল্লির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) শচীন শর্মার মাধ্যমে সরকার প্রথমবারের মতো আন্দোলনরত সিজেপি (CJP) দলের শীর্ষ সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য সৌরভ দাস জানান, “রোববার সন্ধ্যায় ডিসিপি প্রথমে আমাদের কাছে আসেন। তিনি আমাদের সাথে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (ডিএম) একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তাব দেন।”

পরবর্তী ঘটনাবলী উল্লেখ করে সৌরভ দাস আরও বলেন, “আমরা সেই প্রাথমিক প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করি। এরপর সোমবার সকালে তাঁরা একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং পরে একজন কেন্দ্রীয় সচিবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব দেন। আমরা তা-ও পুরোপুরি নাকচ করি। তখন ডিসিপি আমাদের কাছে জানতে চান, আমরা আসলে ঠিক কী চাই। আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিই, আমাদের প্রতিনিধিদল কেবল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কোনো পূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গেই সরাসরি দেখা করবে। এরপর তাঁরা সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নামের একটি তালিকা চান। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আমাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করেন।”

সংসদে যোগ দিতে আসা উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে আসা পুলিশে চাকরিপ্রত্যাশী নীতীশ নামের এক ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য এই দুর্নীতিবাজ সরকারকে অবশ্যই দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।” তিনি কীভাবে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সংসদের এত কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন এবং পুলিশ পথিমধ্যে বাধা দিয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, “প্রথম ব্যারিকেডটা ভেঙে ফেলার পর আমরা সবাই শুধু হেঁটে সামনের দিকে গেছি। মাঝে কেউ আমাদের আর আটকাতে পারেনি।”

রাজধানীর রাজপথে আন্দোলনকারীদের তীব্র মানসিক ও সংখ্যাগত শক্তি দেখে এবং বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার কিছুটা ব্যাকফুটে যায় ও কৌশল পরিবর্তন করে। সিজেপি সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার প্রবীণ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডাকে পূর্ণ দায়িত্ব দেয়। আন্দোলনকারীদের সাথে দীর্ঘ বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক লিখিত বার্তায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আজ সকালে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব আসে। বেলা ১১টা ৫০ মিনিট থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়ে সফলভাবে চলে।”

ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আরও যোগ করেন, “খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আমাদের মধ্যকার এই বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। সিজেপির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রথমে বিস্তারিত মৌখিক আলোচনা হয়। পরবর্তীতে বিকেলে তাঁরা একটি লিখিত আবেদনের কপি জমা দেন। আমি আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারীদের অবিলম্বে তাঁদের রাজপথের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছি। একই সঙ্গে রাজধানীর পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সব ধরনের সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছি।”

এদিকে সংসদের ভেতরেও এনডিএ জোট সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা পরিস্থিতি সামাল দিতে দফায় দফায় বন্ধ ঘরে বৈঠক করেন। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যকার সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সেই লম্বা বৈঠক শেষ হওয়ার পর অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কিছু জানায়নি কেন্দ্র। তবে রাজনৈতিক ওয়াকিফহালদের ধারণা, দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এর জেরে সৃষ্ট নজিরবিহীন বিক্ষোভের প্রশাসনিক সমাধান নিয়েই সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পরবর্তীতে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালও অল্প সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কক্ষে গিয়ে দেখা করেন। তবে একই বিষয়ে তাঁদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো কথা হয়েছে কি না, তা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি।

দিল্লি পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথম দিকে যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ না করতে পুলিশকে ওপর মহল থেকে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা যখন একে একে সব ব্যারিকেড ভেঙে সরাসরি সংসদ ভবনের দিকে এগোতে শুরু করেন, তখন পুলিশ পরিস্থিতি রক্ষায় প্রথমে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে টিয়ারগ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং বাধ্য হয়ে লাঠিপেটা চালায়। নিরাপত্তা বাহিনীর এই কড়া পদক্ষেপে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।

ওই সরকারি কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করে জানান, বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই বিক্ষোভস্থলে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক লোকের সমাবেশ ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের পেছনে চন্দ্রশেখর আজাদের আজাদ সমাজ পার্টি (কাশিরাম), আম আদমি পার্টি (আপ) এবং সমাজবাদী পার্টির (এসপি) সরাসরি সমর্থন ছিল বলে জানা গেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দিল্লিতে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের বিরাট একটি অংশ দিল্লির বাইরের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছিলেন। বিশেষ করে নিকটবর্তী রাজস্থান রাজ্য থেকে বিশাল সংখ্যক তরুণ ও শিক্ষার্থী এই সংসদ ঘেরাও অভিযানে সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীতে স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা: স্বামীর মৃত্যুদণ্ড, ১ লাখ টাকা জরিমানা

ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দোরগোড়ায় দিল্লির নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলন

আপডেট সময় : ১১:২০:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে গত সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) হাজার হাজার ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী একযোগে জড়ো হন। রাজধানীজুড়ে তাঁদের এমন আকস্মিক ও বিশাল উপস্থিতিতে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ও অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মীরা রীতিমতো হতবাক ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

ঘটনাস্থলে কয়েক স্তরের কঠোর ব্যারিকেড নির্মাণ, তিন হাজারের মতো সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং দ্রুত তথ্য ছড়ানো রোধে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরও সেখানে নজিরবিহীন এই ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনাটি ঘটে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ তরুণদের বিশালাকার এই আন্দোলনকারী জনস্রোত একপর্যায়ে ভারতের সংসদ ভবনের একেবারে দোরগোড়াতেও পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে উপর্যুপরি কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে এবং তীব্র লাঠিপেটা করে।

দ্য হিন্দু পত্রিকার একজন সরেজমিন প্রতিবেদক জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো একক শীর্ষ নেতৃত্ব ছাড়াই অর্থাৎ একপ্রকার ‘নেতৃত্বহীন’ এই বিশালাকার বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তর এলাকা থেকে রাইসিনা মার্গ হয়ে সরাসরি সংসদ ভবনের দিকে দ্রুমে এগিয়ে যান। এ সময় প্রথম দিকে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাঁদের পথ রোধে তেমন কোনো বাধা প্রদান করতে পারেনি। সংসদের দিকে যাওয়ার প্রতিটি প্রধান রাস্তা তখন শুধুই সাধারণ আন্দোলনকারী ও বিক্ষোভকারীতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল। উল্লেখযোগ্য যে, গতকাল থেকেই ভারতের সংসদে গুরুত্বর্পূর্ণ বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঠিক এই দিনটিকেই বেছে নিয়ে আন্দোলনকারীরা পুলিশের প্রস্তুত করা প্রতিটি নিরাপত্তা ব্যারিকেড একের পর এক ভেঙে সংসদের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে একপর্যায়ে সংসদ প্রাঙ্গণ থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে বড় বড় বাস আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে পুলিশ ব্যারিকেড সৃষ্টি করে তাঁদের আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

সম্প্রতি সমগ্র ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করা বিতর্কিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সর্বাত্মক ফাঁসের প্রতিবাদেই মূলত এই মহাসংগ্রাম ও বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে। আর এর জের ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে সরাসরি সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের চরম ডাক দেয় তরুণদের অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। মূলত তাদের সেই আহ্বানে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েই সারা দেশ থেকে এই বিশাল জনতা দিল্লিতে এসে একযোগে জড়ো হয়েছিল।

এর আগে এই নিট পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে এবং শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে যন্তর মন্তর প্রাঙ্গণে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন বিশিষ্ট সামাজিক অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তবে গত ১৮ জুলাই ভোরে অনশনস্থল থেকে পুলিশ তাঁকে জোরপূর্বক চক্রান্ত করে তুলে নিয়ে যায়। টানা ২০ দিন ধরে সেখানে তিনি অনশন পালন করছিলেন। সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ কর্তৃক এভাবে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি বিক্ষোভে নতুন মাত্রা ও দাবানল যোগ করে। তাঁর এই নিগ্রহের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে পরবর্তীতে শত শত সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করেন।

দিল্লির রাজপথের এমন জোরালো বিক্ষোভের উত্তাপ রাজপথ ছাড়িয়ে সংসদের ভেতরেও চরমভাবে অনুভূত হয়। এনডিএ সরকারের জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী মন্ত্রীরা দফায় দফায় সংসদ ভবনের ভেতরে রুদ্ধদ্বার জরুরি বৈঠকে বসেন। এর মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিতর্কিত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক টানা প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলে।

জোরালো হচ্ছে বিক্ষোভ, বাধ্য হয়ে নমনীয় কেন্দ্রীয় সরকার: গত রোববার সন্ধ্যায় ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রগুলো দিল্লি সরকারকে আগাম বার্তা দিয়ে জানায় যে, যন্তর মন্তর বিক্ষোভস্থলে দ্রুত লোকসমাগম বৃদ্ধি পাচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের পাওয়ার পর পরই নয়াদিল্লির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) শচীন শর্মার মাধ্যমে সরকার প্রথমবারের মতো আন্দোলনরত সিজেপি (CJP) দলের শীর্ষ সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য সৌরভ দাস জানান, “রোববার সন্ধ্যায় ডিসিপি প্রথমে আমাদের কাছে আসেন। তিনি আমাদের সাথে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (ডিএম) একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তাব দেন।”

পরবর্তী ঘটনাবলী উল্লেখ করে সৌরভ দাস আরও বলেন, “আমরা সেই প্রাথমিক প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করি। এরপর সোমবার সকালে তাঁরা একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং পরে একজন কেন্দ্রীয় সচিবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব দেন। আমরা তা-ও পুরোপুরি নাকচ করি। তখন ডিসিপি আমাদের কাছে জানতে চান, আমরা আসলে ঠিক কী চাই। আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিই, আমাদের প্রতিনিধিদল কেবল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কোনো পূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গেই সরাসরি দেখা করবে। এরপর তাঁরা সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নামের একটি তালিকা চান। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আমাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করেন।”

সংসদে যোগ দিতে আসা উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে আসা পুলিশে চাকরিপ্রত্যাশী নীতীশ নামের এক ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য এই দুর্নীতিবাজ সরকারকে অবশ্যই দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।” তিনি কীভাবে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সংসদের এত কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন এবং পুলিশ পথিমধ্যে বাধা দিয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, “প্রথম ব্যারিকেডটা ভেঙে ফেলার পর আমরা সবাই শুধু হেঁটে সামনের দিকে গেছি। মাঝে কেউ আমাদের আর আটকাতে পারেনি।”

রাজধানীর রাজপথে আন্দোলনকারীদের তীব্র মানসিক ও সংখ্যাগত শক্তি দেখে এবং বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার কিছুটা ব্যাকফুটে যায় ও কৌশল পরিবর্তন করে। সিজেপি সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার প্রবীণ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডাকে পূর্ণ দায়িত্ব দেয়। আন্দোলনকারীদের সাথে দীর্ঘ বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক লিখিত বার্তায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আজ সকালে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব আসে। বেলা ১১টা ৫০ মিনিট থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়ে সফলভাবে চলে।”

ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আরও যোগ করেন, “খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আমাদের মধ্যকার এই বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। সিজেপির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রথমে বিস্তারিত মৌখিক আলোচনা হয়। পরবর্তীতে বিকেলে তাঁরা একটি লিখিত আবেদনের কপি জমা দেন। আমি আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারীদের অবিলম্বে তাঁদের রাজপথের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছি। একই সঙ্গে রাজধানীর পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সব ধরনের সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছি।”

এদিকে সংসদের ভেতরেও এনডিএ জোট সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা পরিস্থিতি সামাল দিতে দফায় দফায় বন্ধ ঘরে বৈঠক করেন। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যকার সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সেই লম্বা বৈঠক শেষ হওয়ার পর অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কিছু জানায়নি কেন্দ্র। তবে রাজনৈতিক ওয়াকিফহালদের ধারণা, দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এর জেরে সৃষ্ট নজিরবিহীন বিক্ষোভের প্রশাসনিক সমাধান নিয়েই সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পরবর্তীতে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালও অল্প সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কক্ষে গিয়ে দেখা করেন। তবে একই বিষয়ে তাঁদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো কথা হয়েছে কি না, তা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি।

দিল্লি পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথম দিকে যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ না করতে পুলিশকে ওপর মহল থেকে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা যখন একে একে সব ব্যারিকেড ভেঙে সরাসরি সংসদ ভবনের দিকে এগোতে শুরু করেন, তখন পুলিশ পরিস্থিতি রক্ষায় প্রথমে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে টিয়ারগ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং বাধ্য হয়ে লাঠিপেটা চালায়। নিরাপত্তা বাহিনীর এই কড়া পদক্ষেপে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।

ওই সরকারি কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করে জানান, বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই বিক্ষোভস্থলে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক লোকের সমাবেশ ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের পেছনে চন্দ্রশেখর আজাদের আজাদ সমাজ পার্টি (কাশিরাম), আম আদমি পার্টি (আপ) এবং সমাজবাদী পার্টির (এসপি) সরাসরি সমর্থন ছিল বলে জানা গেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দিল্লিতে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের বিরাট একটি অংশ দিল্লির বাইরের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছিলেন। বিশেষ করে নিকটবর্তী রাজস্থান রাজ্য থেকে বিশাল সংখ্যক তরুণ ও শিক্ষার্থী এই সংসদ ঘেরাও অভিযানে সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন।