ঢাকা ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচন নিয়ে বাড়ছে সংশয়, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতিতেই ঐকমত্যের অভাব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৭:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩৬ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ এক বছর ধরে আলোচনার পরেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলস্বরূপ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক কোনো ধরনের সমাধান ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের সময় এবং পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রেখেই কমিশন তাদের আলোচনা শেষ করেছে। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অনড় অবস্থানের কারণে ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা এবং দলগুলোর মতামত সমন্বয় করে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে সনদ বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেওয়া হবে। কমিশন আশা করছে, আগামী ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৭ অক্টোবরের মধ্যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে। গত বুধবার বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দলগুলোর সঙ্গে শেষ দিনের আলোচনা শুরু হয় এবং রাত এগারোটার পর তা শেষ হয়। এই শেষ দিনের আলোচনায় দলগুলোকে প্রধানত দুটি ভিন্ন শিবিরে বিভক্ত হতে দেখা যায়। বিএনপি সহ কিছু দল জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোটের পক্ষে অনড় থাকে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সহ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবিতে অবস্থান নেয়। গণভোটের প্রশ্ন কী হবে এবং ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরও কোনো সুরাহা হয়নি। ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। এর খসড়া চূড়ান্ত হলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় তা আটকে আছে। এর ফলে, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এই মতবিরোধ বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও একবার এক অনিশ্চয়তার মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই নির্বাচনকে ক্রমশ অনিশ্চিত করে তুলছে।

জুলাই সনদ নিয়ে অচলাবস্থা ছাড়াও আরও বেশ কিছু ঘটনা গণতন্ত্রের উত্তরণে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অনেকে মনে করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা অস্থিরতা, নতুন নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতীক নিয়ে জটিলতা, সারা দেশে ক্রমবর্ধমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী তৎপরতা নির্বাচনের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।

বর্তমানে দেশের প্রশাসন যেভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বেশ কিছুদিন ধরে সচিববিহীন অবস্থায় আছে, যা এক নজিরবিহীন ঘটনা। সারা দেশে নির্বাচনের জন্য মাঠ প্রশাসন সাজানো বা ফিট লিস্ট তৈরির মতো জরুরি কাজগুলো এখনো শুরু হয়নি, অথচ হাতে সময় আছে মাত্র চার মাস। মাঠ প্রশাসনে এখন আতঙ্ক ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ উভয়ই বলেছে, ‘একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই টেকসই গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।’ ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ কথাটির অর্থ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত পতিত স্বৈরাচারকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি তিনটি নরডিক দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নিষিদ্ধ দলের নেতার বৈঠক রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সরকারের একটি মহল ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে বাড়ছে অবিশ্বাস ও সন্দেহ। জুলাই আন্দোলনের শক্তিগুলো এখন একে অপরের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর, এই পরিস্থিতি দেশে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে, যা নির্বাচনের পথে একটি বড় বাধা।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্প্রতি পরিকল্পিতভাবে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং গুজব সন্ত্রাস চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এলাকাটিতে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও গোলাগুলির ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তেও উত্তেজনা বাড়ছে। আরাকান আর্মি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের আগে এখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা গোটা দেশের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে রহস্যময় আচরণ করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বিভিন্ন ইস্যুতে দলটি ঘন ঘন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। যেমন জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের বিষয়ে তারা প্রথমে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটে রাজি ছিল, কিন্তু বুধবার তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে আগে গণভোটের দাবি জানায়। নির্বাচন ও সংগঠনের চেয়ে এনসিপি’র তরুণরা এখন হুমকি এবং হতাশা প্রকাশ নিয়েই বেশি ব্যস্ত। কদিন আগে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে কথা বলে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। আগামী নির্বাচনে এনসিপি বড় ফ্যাক্টর না হলেও তারা নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে। প্রতীক নিয়ে জটিলতার সমাধান না হলে তেমন কিছু করা অসম্ভব নয়। দলের প্রতীক শাপলা নিয়ে জটিলতা এখন নির্বাচনি রাজনীতির এক নতুন আলোচ্য বিষয়। এনসিপি এখন পর্যন্ত এই প্রতীকে অনড়, এ নিয়ে জটিলতা কমার কোনো লক্ষণ নেই।

গত চৌদ্দ মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সারা দেশে চুরি, ছিনতাই, খুন, নারী নির্যাতন, এমনকি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাতেই এক সপ্তাহে অন্তত পাঁচটি সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে প্রতিদিন প্রাণহানি ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ, আর জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের প্রচারণা এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা—সবকিছুই চাপের মুখে।

এসব সংকটের বিপরীতে একটিই আশার আলো, তা হলো জন-আকাঙ্ক্ষা। দেশের মানুষ একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হলে তা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা, যা জনগণ মেনে নেবে না। দেশে এখন নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সবকিছু অচল হয়ে আছে। একটি নির্বাচিত সরকারই পারে এই অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র একাধিকবার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই জাতি পথ খুঁজে নিয়েছে। এবারও সেই সুযোগ আছে—যদি রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপ ও সমঝোতার পথে ফিরে আসে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু অনিশ্চিতই হবে না, বরং জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীর ছয় থানা এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৬০ জন গ্রেপ্তার

নির্বাচন নিয়ে বাড়ছে সংশয়, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতিতেই ঐকমত্যের অভাব

আপডেট সময় : ০৭:৪৭:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫

দীর্ঘ এক বছর ধরে আলোচনার পরেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলস্বরূপ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক কোনো ধরনের সমাধান ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের সময় এবং পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রেখেই কমিশন তাদের আলোচনা শেষ করেছে। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অনড় অবস্থানের কারণে ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা এবং দলগুলোর মতামত সমন্বয় করে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে সনদ বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেওয়া হবে। কমিশন আশা করছে, আগামী ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৭ অক্টোবরের মধ্যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে। গত বুধবার বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দলগুলোর সঙ্গে শেষ দিনের আলোচনা শুরু হয় এবং রাত এগারোটার পর তা শেষ হয়। এই শেষ দিনের আলোচনায় দলগুলোকে প্রধানত দুটি ভিন্ন শিবিরে বিভক্ত হতে দেখা যায়। বিএনপি সহ কিছু দল জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোটের পক্ষে অনড় থাকে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সহ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবিতে অবস্থান নেয়। গণভোটের প্রশ্ন কী হবে এবং ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরও কোনো সুরাহা হয়নি। ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। এর খসড়া চূড়ান্ত হলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় তা আটকে আছে। এর ফলে, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এই মতবিরোধ বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও একবার এক অনিশ্চয়তার মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই নির্বাচনকে ক্রমশ অনিশ্চিত করে তুলছে।

জুলাই সনদ নিয়ে অচলাবস্থা ছাড়াও আরও বেশ কিছু ঘটনা গণতন্ত্রের উত্তরণে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অনেকে মনে করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা অস্থিরতা, নতুন নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতীক নিয়ে জটিলতা, সারা দেশে ক্রমবর্ধমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী তৎপরতা নির্বাচনের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।

বর্তমানে দেশের প্রশাসন যেভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বেশ কিছুদিন ধরে সচিববিহীন অবস্থায় আছে, যা এক নজিরবিহীন ঘটনা। সারা দেশে নির্বাচনের জন্য মাঠ প্রশাসন সাজানো বা ফিট লিস্ট তৈরির মতো জরুরি কাজগুলো এখনো শুরু হয়নি, অথচ হাতে সময় আছে মাত্র চার মাস। মাঠ প্রশাসনে এখন আতঙ্ক ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ উভয়ই বলেছে, ‘একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই টেকসই গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।’ ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ কথাটির অর্থ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত পতিত স্বৈরাচারকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি তিনটি নরডিক দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নিষিদ্ধ দলের নেতার বৈঠক রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সরকারের একটি মহল ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে বাড়ছে অবিশ্বাস ও সন্দেহ। জুলাই আন্দোলনের শক্তিগুলো এখন একে অপরের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর, এই পরিস্থিতি দেশে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে, যা নির্বাচনের পথে একটি বড় বাধা।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্প্রতি পরিকল্পিতভাবে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং গুজব সন্ত্রাস চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এলাকাটিতে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও গোলাগুলির ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তেও উত্তেজনা বাড়ছে। আরাকান আর্মি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের আগে এখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা গোটা দেশের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে রহস্যময় আচরণ করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বিভিন্ন ইস্যুতে দলটি ঘন ঘন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। যেমন জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের বিষয়ে তারা প্রথমে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটে রাজি ছিল, কিন্তু বুধবার তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে আগে গণভোটের দাবি জানায়। নির্বাচন ও সংগঠনের চেয়ে এনসিপি’র তরুণরা এখন হুমকি এবং হতাশা প্রকাশ নিয়েই বেশি ব্যস্ত। কদিন আগে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে কথা বলে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। আগামী নির্বাচনে এনসিপি বড় ফ্যাক্টর না হলেও তারা নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে। প্রতীক নিয়ে জটিলতার সমাধান না হলে তেমন কিছু করা অসম্ভব নয়। দলের প্রতীক শাপলা নিয়ে জটিলতা এখন নির্বাচনি রাজনীতির এক নতুন আলোচ্য বিষয়। এনসিপি এখন পর্যন্ত এই প্রতীকে অনড়, এ নিয়ে জটিলতা কমার কোনো লক্ষণ নেই।

গত চৌদ্দ মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সারা দেশে চুরি, ছিনতাই, খুন, নারী নির্যাতন, এমনকি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাতেই এক সপ্তাহে অন্তত পাঁচটি সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে প্রতিদিন প্রাণহানি ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ, আর জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের প্রচারণা এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা—সবকিছুই চাপের মুখে।

এসব সংকটের বিপরীতে একটিই আশার আলো, তা হলো জন-আকাঙ্ক্ষা। দেশের মানুষ একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হলে তা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা, যা জনগণ মেনে নেবে না। দেশে এখন নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সবকিছু অচল হয়ে আছে। একটি নির্বাচিত সরকারই পারে এই অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র একাধিকবার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই জাতি পথ খুঁজে নিয়েছে। এবারও সেই সুযোগ আছে—যদি রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপ ও সমঝোতার পথে ফিরে আসে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু অনিশ্চিতই হবে না, বরং জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।