ঢাকা ০৪:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

গাজার এক যুবকের বইয়ে ইসরায়েলি গণহত্যা

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা ও নারকীয় হামলার সবই কি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে? কিছু অবর্ণনীয় হামলা, নির্যাতন আর দুঃস্বপ্নের ঘটনা তো অব্যক্তই রয়ে গেছে। গাজাবাসীর সেই না–বলা কষ্ট, বেদনা ও মানবিক গল্প তুলে ধরছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি এক যুবক, তার নিজের বইয়ের মাধ্যমে। যুবকের নাম ওয়াসিম সাঈদ।

২৪ বছর বয়সি সাঈদ তার বই ‘উইটনেস টু দ্য হেলফায়ার অব জেনোসাইড’–এ গত দুই বছরের লাগাতার যুদ্ধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি, ইসরায়েলের অবিরাম বোমাবর্ষণ, স্থল অভিযান, ধ্বংসযজ্ঞ ও বাধ্যতামূলক ক্ষুধার বাস্তবতা নথিবদ্ধ করেছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার রিপোর্টার হানি মাহমুদকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সাঈদ। কীভাবে তিনি একটি খালি তাঁবুর ভেতরে বসে লেখেন—যেখানে গরমে কোনও সুরক্ষা নেই, শীতে ঠান্ডা বা ভারী বৃষ্টির বিরুদ্ধেও কোনও ব্যবস্থা নেই।

ওয়াসিম সাঈদ বলেন, ‘বাস্তুচ্যুতির স্থান আর তাঁবুগুলো জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমরা বাধ্য হয়ে এই দুর্দশার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছি— যদিও তা প্রায় অসম্ভব।’

তার বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের নাম কোনও মানুষ, কোনও স্থান, বা কোনও স্মৃতির নামে— যা তিনি হারিয়ে যেতে দিতে চান না।

সাঈদ বলেন, ‘আমি কারও দয়া চাই না। চাই এমন বিবেক, যা পচে যায়নি… এমন মানুষ, যার হৃদয় পাথর হয়ে যায়নি। এমন পাঠক, যে বই বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফি খেতে চলে যাবে না।’

গাজার অবকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ায় বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট নেই, তাই তিনি বহু রাত মোমবাতির আলোয় লিখেছেন।

সাঈদ জানান, স্বীকৃতির জন্য তিনি লেখেন না। লেখেন, নিজের আবেগ প্রকাশের জন্য এবং ঘটে যাওয়া অপরাধের সাক্ষ্য রাখতে। ‘আমি ভেঙে পড়েছিলাম। রাগ সামলাতে পারছিলাম না। লিখতে বাধ্য হয়েছিলাম— এটাই ছিল একমাত্র উপায়।’

শুরুতে নিজের অভিজ্ঞতা লিখলেও পরে দেখেন, আরও বহু মানুষের এমন ভয়াবহ কাহিনি আছে, যা মানুষ ভাবতেও পারে না।

তিনি লিখেছেন—“যাদের হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, কেউ জানতেও পারেনি তাদের শেষ মুহূর্ত। তাদের ভয়। এ অধ্যায়ের নাম দিয়েছি—‘অ্যানটোল্ড স্টোরিজ’।’’

তার কাছে প্রতিটি পৃষ্ঠা ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ।

সাঈদ বলেন, ‘অনেক সময় মনে হয়েছে মৃত্যু অবধারিত। তবুও আমি লিখেছি, যেন কিছু রেখে যেতে পারি— একজন শহীদ নয়, একজন সাক্ষী হিসেবে। গল্পগুলো হারিয়ে যায় যদি লেখা না থাকে।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং অসংখ্য হাসপাতাল, স্কুল, বাড়িঘর ধ্বংস— এই প্রেক্ষাপটে তিনি কখনো ভাবেন, লিখে কী লাভ, বাঁচারই বা কী মানে? তবুও তিনি আশা হারাননি।

সাঈদ বলেছেন, ‘মানুষ যে কোনও পরিস্থিতিতে আশার আলো খোঁজে। ক্ষুধা আর মৃত্যুর ছবি যতই ভয়াবহ হোক— বিশ্বাস করি, লেখা গুরুত্বপূর্ণ।’

সূত্র: আল জাজিরা

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, বৈঠক নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা

গাজার এক যুবকের বইয়ে ইসরায়েলি গণহত্যা

আপডেট সময় : ০৮:২২:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা ও নারকীয় হামলার সবই কি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে? কিছু অবর্ণনীয় হামলা, নির্যাতন আর দুঃস্বপ্নের ঘটনা তো অব্যক্তই রয়ে গেছে। গাজাবাসীর সেই না–বলা কষ্ট, বেদনা ও মানবিক গল্প তুলে ধরছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি এক যুবক, তার নিজের বইয়ের মাধ্যমে। যুবকের নাম ওয়াসিম সাঈদ।

২৪ বছর বয়সি সাঈদ তার বই ‘উইটনেস টু দ্য হেলফায়ার অব জেনোসাইড’–এ গত দুই বছরের লাগাতার যুদ্ধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি, ইসরায়েলের অবিরাম বোমাবর্ষণ, স্থল অভিযান, ধ্বংসযজ্ঞ ও বাধ্যতামূলক ক্ষুধার বাস্তবতা নথিবদ্ধ করেছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার রিপোর্টার হানি মাহমুদকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সাঈদ। কীভাবে তিনি একটি খালি তাঁবুর ভেতরে বসে লেখেন—যেখানে গরমে কোনও সুরক্ষা নেই, শীতে ঠান্ডা বা ভারী বৃষ্টির বিরুদ্ধেও কোনও ব্যবস্থা নেই।

ওয়াসিম সাঈদ বলেন, ‘বাস্তুচ্যুতির স্থান আর তাঁবুগুলো জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমরা বাধ্য হয়ে এই দুর্দশার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছি— যদিও তা প্রায় অসম্ভব।’

তার বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের নাম কোনও মানুষ, কোনও স্থান, বা কোনও স্মৃতির নামে— যা তিনি হারিয়ে যেতে দিতে চান না।

সাঈদ বলেন, ‘আমি কারও দয়া চাই না। চাই এমন বিবেক, যা পচে যায়নি… এমন মানুষ, যার হৃদয় পাথর হয়ে যায়নি। এমন পাঠক, যে বই বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফি খেতে চলে যাবে না।’

গাজার অবকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ায় বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট নেই, তাই তিনি বহু রাত মোমবাতির আলোয় লিখেছেন।

সাঈদ জানান, স্বীকৃতির জন্য তিনি লেখেন না। লেখেন, নিজের আবেগ প্রকাশের জন্য এবং ঘটে যাওয়া অপরাধের সাক্ষ্য রাখতে। ‘আমি ভেঙে পড়েছিলাম। রাগ সামলাতে পারছিলাম না। লিখতে বাধ্য হয়েছিলাম— এটাই ছিল একমাত্র উপায়।’

শুরুতে নিজের অভিজ্ঞতা লিখলেও পরে দেখেন, আরও বহু মানুষের এমন ভয়াবহ কাহিনি আছে, যা মানুষ ভাবতেও পারে না।

তিনি লিখেছেন—“যাদের হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, কেউ জানতেও পারেনি তাদের শেষ মুহূর্ত। তাদের ভয়। এ অধ্যায়ের নাম দিয়েছি—‘অ্যানটোল্ড স্টোরিজ’।’’

তার কাছে প্রতিটি পৃষ্ঠা ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ।

সাঈদ বলেন, ‘অনেক সময় মনে হয়েছে মৃত্যু অবধারিত। তবুও আমি লিখেছি, যেন কিছু রেখে যেতে পারি— একজন শহীদ নয়, একজন সাক্ষী হিসেবে। গল্পগুলো হারিয়ে যায় যদি লেখা না থাকে।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং অসংখ্য হাসপাতাল, স্কুল, বাড়িঘর ধ্বংস— এই প্রেক্ষাপটে তিনি কখনো ভাবেন, লিখে কী লাভ, বাঁচারই বা কী মানে? তবুও তিনি আশা হারাননি।

সাঈদ বলেছেন, ‘মানুষ যে কোনও পরিস্থিতিতে আশার আলো খোঁজে। ক্ষুধা আর মৃত্যুর ছবি যতই ভয়াবহ হোক— বিশ্বাস করি, লেখা গুরুত্বপূর্ণ।’

সূত্র: আল জাজিরা