ঢাকা ০১:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

রাজশাহীতে এইচআইভি পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, ৬৬ শতাংশই সমকামী

রাজশাহীতে এইচআইভি শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলায় মোট ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, শনাক্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশ সমকামী পুরুষ বা হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ যৌন আচরণ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে তারা এইচআইভি আক্রান্তদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কমানোরও আহ্বান জানিয়েছেন।

রামেকের তথ্য কী বলছে?

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৫২ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে।

আক্রান্তদের মধ্যে ১০৫ জন পুরুষ, ৯ জন নারী এবং একজন হিজড়া। বিবাহিত ৪৮ জন এবং অবিবাহিত ৬৭ জন।

বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।

ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, ৫৮ জন সমকামী পুরুষ, ৩৫ জন যৌনকর্মীর সংস্পর্শে আসার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি, দুজন যক্ষ্মা রোগী, একজন যৌনকর্মী, দুজন হিজড়া এবং ১৪ জন অন্যান্য শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অতিরিক্ত তথ্য

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রামেক হাসপাতালের বাইরে আরও ৩৪ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিনজন হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য। ২৫ জন বিবাহিত ও ছয়জন অবিবাহিত। বয়স অনুযায়ী ২৫ বছরের নিচে নয়জন এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন।

রাজশাহী বিভাগে আক্রান্ত প্রায় ৮০০

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭৯৪।

এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩১০ জন, রাজশাহীতে ১৩১, বগুড়ায় ১০৯, পাবনায় ৭৮, নওগাঁয় ৬৫, নাটোরে ৪৩, জয়পুরহাটে ৩৭ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন শনাক্ত হয়েছেন।

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, গত কয়েক বছরে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।

তার ভাষ্য, নিরাপত্তাহীন যৌন সম্পর্ক, পরীক্ষাবিহীন রক্ত গ্রহণ, একই সুঁচ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার এবং মা থেকে শিশুর মধ্যেও এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে।

তিনি বলেন, পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি রিসেপ্টিভ পার্টনার হন, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্য কমানোর আহ্বান

এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোষ’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, এইচআইভি আক্রান্ত মানেই এটি যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

তিনি বলেন, আক্রান্তরা পরিবার ও সমাজে বৈষম্যের শিকার হন। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

চিকিৎসাসেবা নিয়ে কিছু ভোগান্তি

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু হলেও ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে শনাক্ত হওয়া অনেক রোগীকে এখনও বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহীতে এআরটি সেন্টার চালু হয়েছে। নতুন রোগীরা স্থানীয়ভাবেই চিকিৎসা ও ওষুধ পাচ্ছেন।

তিনি জানান, পুরোনো রোগীদের ফাইল ধাপে ধাপে রাজশাহীতে স্থানান্তরের কাজ চলছে এবং খুব শিগগিরই সবাই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাসেবা পাবেন।

ডা. ইব্রাহিম আরও বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়া ইতিবাচক দিক। কারণ দ্রুত শনাক্ত হলে চিকিৎসা শুরু করা যায় এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমে।

তবে রাজশাহীতে এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে কতজন ইতোমধ্যে এইডস পর্যায়ে পৌঁছেছেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

এইচএসসি আইসিটি: দ্বিতীয় অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

রাজশাহীতে এইচআইভি পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, ৬৬ শতাংশই সমকামী

আপডেট সময় : ১১:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

রাজশাহীতে এইচআইভি শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলায় মোট ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, শনাক্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশ সমকামী পুরুষ বা হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ যৌন আচরণ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে তারা এইচআইভি আক্রান্তদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কমানোরও আহ্বান জানিয়েছেন।

রামেকের তথ্য কী বলছে?

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৫২ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে।

আক্রান্তদের মধ্যে ১০৫ জন পুরুষ, ৯ জন নারী এবং একজন হিজড়া। বিবাহিত ৪৮ জন এবং অবিবাহিত ৬৭ জন।

বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।

ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, ৫৮ জন সমকামী পুরুষ, ৩৫ জন যৌনকর্মীর সংস্পর্শে আসার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি, দুজন যক্ষ্মা রোগী, একজন যৌনকর্মী, দুজন হিজড়া এবং ১৪ জন অন্যান্য শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অতিরিক্ত তথ্য

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রামেক হাসপাতালের বাইরে আরও ৩৪ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিনজন হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য। ২৫ জন বিবাহিত ও ছয়জন অবিবাহিত। বয়স অনুযায়ী ২৫ বছরের নিচে নয়জন এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন।

রাজশাহী বিভাগে আক্রান্ত প্রায় ৮০০

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭৯৪।

এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩১০ জন, রাজশাহীতে ১৩১, বগুড়ায় ১০৯, পাবনায় ৭৮, নওগাঁয় ৬৫, নাটোরে ৪৩, জয়পুরহাটে ৩৭ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন শনাক্ত হয়েছেন।

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, গত কয়েক বছরে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।

তার ভাষ্য, নিরাপত্তাহীন যৌন সম্পর্ক, পরীক্ষাবিহীন রক্ত গ্রহণ, একই সুঁচ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার এবং মা থেকে শিশুর মধ্যেও এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে।

তিনি বলেন, পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি রিসেপ্টিভ পার্টনার হন, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্য কমানোর আহ্বান

এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোষ’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, এইচআইভি আক্রান্ত মানেই এটি যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

তিনি বলেন, আক্রান্তরা পরিবার ও সমাজে বৈষম্যের শিকার হন। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

চিকিৎসাসেবা নিয়ে কিছু ভোগান্তি

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু হলেও ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে শনাক্ত হওয়া অনেক রোগীকে এখনও বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহীতে এআরটি সেন্টার চালু হয়েছে। নতুন রোগীরা স্থানীয়ভাবেই চিকিৎসা ও ওষুধ পাচ্ছেন।

তিনি জানান, পুরোনো রোগীদের ফাইল ধাপে ধাপে রাজশাহীতে স্থানান্তরের কাজ চলছে এবং খুব শিগগিরই সবাই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাসেবা পাবেন।

ডা. ইব্রাহিম আরও বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়া ইতিবাচক দিক। কারণ দ্রুত শনাক্ত হলে চিকিৎসা শুরু করা যায় এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমে।

তবে রাজশাহীতে এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে কতজন ইতোমধ্যে এইডস পর্যায়ে পৌঁছেছেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।