ঢাকা ০২:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

বাজেট বরাদ্দ: বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও জনসেবার মান কেন অধরা?

বাংলাদেশের বাজেট আলোচনায় একটি জরুরি প্রশ্ন প্রায়শই অনুচ্চারিত থেকে যায়, যা সংসদ কিংবা অন্য কোনো ফোরামে গুরুত্ব পায় না। এর ফলস্বরূপ বাজেট-কেন্দ্রিক আলোচনা গতানুগতিক, অগভীর এবং প্রায়শই ফলহীন হয়ে ওঠে। দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাবিত বাজেটই বড় ধরনের সংশোধন ছাড়াই পাস হয়েছে, কারণ আলোচনাগুলো সাধারণত এমন প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত থাকে যার উত্তর মোটামুটি সকলেরই জানা। যেমন, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশের বদলে ২ শতাংশ বরাদ্দ কেন, অথবা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি করা হলো কেন ইত্যাদি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো— ‘এত বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে বাস্তব ফল নিশ্চিত করতে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে?’ এই প্রশ্নটি শুধু শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতেই নয়, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচনসহ প্রতিটি খাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

প্রশ্নটি বোঝার জন্য শিক্ষা খাতের দিকে নজর দেওয়া যাক। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১১,১৫৭ কোটি টাকা—অর্থাৎ প্রায় ৩৫ গুণ বৃদ্ধি। প্রশ্ন হলো, বাজেট ৩৫ গুণ বাড়লেও কি শিক্ষার মান বা কার্যকারিতা ৩৫ গুণ বেড়েছে?

বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। শিক্ষার আওতা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও গুণগত মান উদ্বেগজনকভাবে তলানিতে ঠেকেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণি উত্তীর্ণ প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক গণিত দক্ষতা নেই। একইভাবে, একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ একটি বাংলা বাক্যের সব শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারেননি।

স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০০০-০১ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১,১১২ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪১,৪০৮ কোটি টাকা—প্রায় ৩৭ গুণ বৃদ্ধি। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বা বিস্তৃতি কি ৩৭ গুণ উন্নত হয়েছে?

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, বাজেটের কাজ তো বরাদ্দ দেওয়া; ব্যয়ের ফল নিশ্চিত করা কি বাজেটের দায়িত্ব? উত্তর হলো—হ্যাঁ, অন্তত তার জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ অবশ্যই আছে। এজন্য আলোচনার টেবিলে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর মতো বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে আনা উচিত, যা এক দশক ধরে বাজেটের সঙ্গে প্রকাশিত হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় আহত শিবির নেতা সালাউদ্দিনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর

বাজেট বরাদ্দ: বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও জনসেবার মান কেন অধরা?

আপডেট সময় : ১০:২৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের বাজেট আলোচনায় একটি জরুরি প্রশ্ন প্রায়শই অনুচ্চারিত থেকে যায়, যা সংসদ কিংবা অন্য কোনো ফোরামে গুরুত্ব পায় না। এর ফলস্বরূপ বাজেট-কেন্দ্রিক আলোচনা গতানুগতিক, অগভীর এবং প্রায়শই ফলহীন হয়ে ওঠে। দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাবিত বাজেটই বড় ধরনের সংশোধন ছাড়াই পাস হয়েছে, কারণ আলোচনাগুলো সাধারণত এমন প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত থাকে যার উত্তর মোটামুটি সকলেরই জানা। যেমন, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশের বদলে ২ শতাংশ বরাদ্দ কেন, অথবা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি করা হলো কেন ইত্যাদি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো— ‘এত বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে বাস্তব ফল নিশ্চিত করতে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে?’ এই প্রশ্নটি শুধু শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতেই নয়, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচনসহ প্রতিটি খাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

প্রশ্নটি বোঝার জন্য শিক্ষা খাতের দিকে নজর দেওয়া যাক। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১১,১৫৭ কোটি টাকা—অর্থাৎ প্রায় ৩৫ গুণ বৃদ্ধি। প্রশ্ন হলো, বাজেট ৩৫ গুণ বাড়লেও কি শিক্ষার মান বা কার্যকারিতা ৩৫ গুণ বেড়েছে?

বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। শিক্ষার আওতা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও গুণগত মান উদ্বেগজনকভাবে তলানিতে ঠেকেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণি উত্তীর্ণ প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক গণিত দক্ষতা নেই। একইভাবে, একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ একটি বাংলা বাক্যের সব শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারেননি।

স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০০০-০১ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১,১১২ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪১,৪০৮ কোটি টাকা—প্রায় ৩৭ গুণ বৃদ্ধি। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বা বিস্তৃতি কি ৩৭ গুণ উন্নত হয়েছে?

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, বাজেটের কাজ তো বরাদ্দ দেওয়া; ব্যয়ের ফল নিশ্চিত করা কি বাজেটের দায়িত্ব? উত্তর হলো—হ্যাঁ, অন্তত তার জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ অবশ্যই আছে। এজন্য আলোচনার টেবিলে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর মতো বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে আনা উচিত, যা এক দশক ধরে বাজেটের সঙ্গে প্রকাশিত হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।