ঢাকা ০৪:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

মধ্যযুগ: জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুমুখী চর্চার স্বর্ণযুগ ও আইয়ুবিদের অবদান

বর্তমানে ‘মাদরাসা’ শব্দটি মূলত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করলেও, মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মাদরাসার ধারণা ছিল আরও অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। সে সময়ের মাদরাসাগুলো কেবল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই ছিল না, বরং তা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে ওঠা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। সেখানে ধর্মীয় বিদ্যার পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং প্রশাসনিক বিদ্যারও চর্চা হতো। এই প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈশ্বিক বিকাশের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আইয়ুবি শাসকদের (১১৭১-১২৫০ খ্রি.) অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মিশর ও শামজুড়ে অসংখ্য মাদরাসা, দারুল হাদিস ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে, যা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি যখন বৃহত্তর সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মিশরে ফিরে আসেন, তখন তিনি সেখানে শিক্ষার বিস্তার ও সুন্নি ভাবধারার প্রচারে বিশেষ উদ্যোগ নেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। আইয়ুবি শাসনামলে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং তাঁর উত্তরসূরিদের তত্ত্বাবধানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নে এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়। ফাতেমি আমলের শিয়া মতাদর্শের প্রভাব কাটিয়ে বৃহত্তর সুন্নি মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ক্ষেত্রে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষাবিপ্লবের প্রধান কেন্দ্র ছিল কায়রো, দামেস্ক এবং আলেকজান্দ্রিয়া। ফাতেমিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব মুছে সুন্নি মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী করা ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই মাদরাসাগুলো থেকে বিজ্ঞ আলেম, দক্ষ বিচারক, প্রশাসক এবং আমলা তৈরি হতেন, যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বহুমুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল। কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), সাহিত্য এবং অলংকার শাস্ত্র (বালাগাত) ছাড়াও যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ গণিতশাস্ত্রের চর্চাও নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত ছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এভারেস্ট জয়ী নুরুননাহার নিম্নিকে পূবালী ব্যাংকের সংবর্ধনা

মধ্যযুগ: জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুমুখী চর্চার স্বর্ণযুগ ও আইয়ুবিদের অবদান

আপডেট সময় : ০২:০৮:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বর্তমানে ‘মাদরাসা’ শব্দটি মূলত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করলেও, মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মাদরাসার ধারণা ছিল আরও অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। সে সময়ের মাদরাসাগুলো কেবল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই ছিল না, বরং তা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে ওঠা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। সেখানে ধর্মীয় বিদ্যার পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং প্রশাসনিক বিদ্যারও চর্চা হতো। এই প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈশ্বিক বিকাশের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আইয়ুবি শাসকদের (১১৭১-১২৫০ খ্রি.) অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মিশর ও শামজুড়ে অসংখ্য মাদরাসা, দারুল হাদিস ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে, যা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি যখন বৃহত্তর সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মিশরে ফিরে আসেন, তখন তিনি সেখানে শিক্ষার বিস্তার ও সুন্নি ভাবধারার প্রচারে বিশেষ উদ্যোগ নেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। আইয়ুবি শাসনামলে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং তাঁর উত্তরসূরিদের তত্ত্বাবধানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নে এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়। ফাতেমি আমলের শিয়া মতাদর্শের প্রভাব কাটিয়ে বৃহত্তর সুন্নি মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ক্ষেত্রে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষাবিপ্লবের প্রধান কেন্দ্র ছিল কায়রো, দামেস্ক এবং আলেকজান্দ্রিয়া। ফাতেমিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব মুছে সুন্নি মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী করা ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই মাদরাসাগুলো থেকে বিজ্ঞ আলেম, দক্ষ বিচারক, প্রশাসক এবং আমলা তৈরি হতেন, যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বহুমুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল। কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), সাহিত্য এবং অলংকার শাস্ত্র (বালাগাত) ছাড়াও যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ গণিতশাস্ত্রের চর্চাও নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত ছিল।