ঢাকা ০৬:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

বিদ্যুৎ খাতে নৈরাজ্য ও জনগণের উপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা: এক বিশ্লেষণ

দেশের বিদ্যুৎ খাত এক গভীর নৈরাজ্যের শিকার, যা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। যদিও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের মাফিয়াতন্ত্রের প্রভাব এখনো বিদ্যমান। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘকাল ধরে যে বিশৃঙ্খলা চলছে, তাকে মোটা দাগে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়: ২০০৯ সালের আগের অবস্থা এবং পরবর্তী অবস্থা। ২০০৯ সাল পর্যন্ত মূল সমস্যা ছিল চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি এবং অসহনীয় বিভ্রাট। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের বিদ্যুৎ খাতে ধারাবাহিক ব্যর্থতাই এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল।

বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটকে পুঁজি করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার বিনা টেন্ডারে ৩২টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়, যা এই খাতে সীমাহীন লুটপাট ও নৈরাজ্যের সুযোগ তৈরি করে। পরবর্তীতে বিনা টেন্ডারে আরও ৭২টি রেন্টাল ও ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) স্থাপন করা হয়। যদিও দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ তখন দুই থেকে আড়াই টাকা ছিল, কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ টাকা দরে কেনা হতো, যা পরবর্তীতে ২৬ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য কুইক রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও, ১৬ বছর পরও তা বহাল রাখা হয়। বিনা টেন্ডারে অনুমোদনপ্রাপ্ত এই বিতর্কিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য দায়মুক্তি আইন পাস করা হয় এবং আদালতে যাওয়ার পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিদ্যুতের অভাবে শিল্প-কারখানায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ বন্ধ রেখে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে বাধ্য হতো। মানুষ তখন বিদ্যুতের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এই অবস্থায়, উচ্চমূল্যের এবং নিয়মনীতি লঙ্ঘনকারী গণবিরোধী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা উঠলেও, শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। এই সুযোগে, দেশের অসহায় মানুষকে আওয়ামী সরকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে জিম্মি করে ফেলে। ফলে, সাধারণ মানুষ দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যুতের জন্য অতি উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও, রাজধানী শহর ছাড়া দেশের অনেক গ্রামীণ অঞ্চলে গভীর রাত ছাড়া বিদ্যুৎ পাওয়া এখনও দুষ্কর।

শেখ হাসিনা সরকার বিনা টেন্ডারে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিল, তার সবই ছিল বিতর্কিত এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদিত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সাংবাদিকদের ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম: সেলিম উদ্দিন

বিদ্যুৎ খাতে নৈরাজ্য ও জনগণের উপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা: এক বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ১১:৩৪:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

দেশের বিদ্যুৎ খাত এক গভীর নৈরাজ্যের শিকার, যা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। যদিও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের মাফিয়াতন্ত্রের প্রভাব এখনো বিদ্যমান। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘকাল ধরে যে বিশৃঙ্খলা চলছে, তাকে মোটা দাগে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়: ২০০৯ সালের আগের অবস্থা এবং পরবর্তী অবস্থা। ২০০৯ সাল পর্যন্ত মূল সমস্যা ছিল চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি এবং অসহনীয় বিভ্রাট। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের বিদ্যুৎ খাতে ধারাবাহিক ব্যর্থতাই এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল।

বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটকে পুঁজি করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার বিনা টেন্ডারে ৩২টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়, যা এই খাতে সীমাহীন লুটপাট ও নৈরাজ্যের সুযোগ তৈরি করে। পরবর্তীতে বিনা টেন্ডারে আরও ৭২টি রেন্টাল ও ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) স্থাপন করা হয়। যদিও দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ তখন দুই থেকে আড়াই টাকা ছিল, কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ টাকা দরে কেনা হতো, যা পরবর্তীতে ২৬ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য কুইক রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও, ১৬ বছর পরও তা বহাল রাখা হয়। বিনা টেন্ডারে অনুমোদনপ্রাপ্ত এই বিতর্কিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য দায়মুক্তি আইন পাস করা হয় এবং আদালতে যাওয়ার পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিদ্যুতের অভাবে শিল্প-কারখানায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ বন্ধ রেখে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে বাধ্য হতো। মানুষ তখন বিদ্যুতের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এই অবস্থায়, উচ্চমূল্যের এবং নিয়মনীতি লঙ্ঘনকারী গণবিরোধী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা উঠলেও, শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। এই সুযোগে, দেশের অসহায় মানুষকে আওয়ামী সরকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে জিম্মি করে ফেলে। ফলে, সাধারণ মানুষ দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যুতের জন্য অতি উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও, রাজধানী শহর ছাড়া দেশের অনেক গ্রামীণ অঞ্চলে গভীর রাত ছাড়া বিদ্যুৎ পাওয়া এখনও দুষ্কর।

শেখ হাসিনা সরকার বিনা টেন্ডারে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিল, তার সবই ছিল বিতর্কিত এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদিত।