ঢাকা ০৬:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভাটির কান্না, উজানের খাপছাড়া সুর

একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি ছিল এর সুর আর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মরমি কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীমের গাওয়া লোকসংগীত যেমন পল্লিকবির জসীমউদ্দীনের লেখায় এঁকে দিত নদীমাতৃক বাংলাদেশের ছবি, তেমনই প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করত। কিন্তু অনেক প্রজন্মের দেখা সেই চিত্র এখন অতীত। বাংলাদেশের প্রায় ৭০০ নদ-নদী, শাখা ও উপনদীর অধিকাংশই আজ মৃতপ্রায়; শুকনো মৌসুমে অনেকটাই পানিশূন্য আর হঠাৎ বন্যা হলে পানি ধারণে অক্ষম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ষাকালে প্লাবনভূমির জলমগ্নতা নিরূপণ করত এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, কিন্তু সাম্প্রতিক দু’দশকে প্রায় শূন্য বা বিরল হয়ে পড়েছে সেই অতি স্বাভাবিক জলমগ্নতা।

এমতাবস্থায়, উজান দেশের ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন সুর। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) লোকসভা সদস্য নিশিকান্ত দুবে অভিযোগ করেছেন যে, অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশকে দেওয়ায় ভারতের কৃষকরা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। হতে পারে এটি নিছক কথার চাল, অথবা নয়াদিল্লির নীরব অবস্থানের প্রতিফলন। বিষয়টি বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারবেন, বিশেষ করে যখন ভারতীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হবে।

তবে দুবের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতি ভারতের পুরোনো আধিপত্যবাদী মনোভাবের ইঙ্গিতবাহী। সেই মানসিকতায় নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ অনুযায়ী পানি বা জল পাওয়া নিম্ন অববাহিকার দেশটির ন্যায্য অধিকারকে স্বীকার করা হয় না। সম্প্রতি এক্সে (সাবেক টুইটার) তার একাধিকবার লেখা প্রশ্নবোধক চিহ্নে বিবৃতিমূলক বাক্য—‘পানি বাংলাদেশে চলে যায়?’—এমন ধারণা দেয় যেন আন্তঃসীমান্ত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অন্যায্য বা অস্বাভাবিক। নিজের দেশেরও কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রধানত দুটি নদীর পানিবণ্টন-সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন এই আইনপ্রণেতা। তার দাবি, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে নদীর পানি ভাগাভাগি করা হয়েছে ভারতের নিজস্ব প্রয়োজন না মিটিয়েই।’

সবাই জানে, এই ভারতীয় ভদ্রলোকের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কয়েক দশক ধরে গঙ্গা ছাড়া প্রায় সব আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি একতরফাভাবেই প্রত্যাহার করে এসেছে ভারত। ভারত থেকে বা ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবাহিত হওয়া নদ-নদীর সংখ্যা ৫৪টি। এসব নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সমস্যা তৈরি করেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রেমের সম্পর্কে ইতি টেনেছেন শর্বরী ও সানি!

নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভাটির কান্না, উজানের খাপছাড়া সুর

আপডেট সময় : ০১:২৩:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি ছিল এর সুর আর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মরমি কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীমের গাওয়া লোকসংগীত যেমন পল্লিকবির জসীমউদ্দীনের লেখায় এঁকে দিত নদীমাতৃক বাংলাদেশের ছবি, তেমনই প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করত। কিন্তু অনেক প্রজন্মের দেখা সেই চিত্র এখন অতীত। বাংলাদেশের প্রায় ৭০০ নদ-নদী, শাখা ও উপনদীর অধিকাংশই আজ মৃতপ্রায়; শুকনো মৌসুমে অনেকটাই পানিশূন্য আর হঠাৎ বন্যা হলে পানি ধারণে অক্ষম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ষাকালে প্লাবনভূমির জলমগ্নতা নিরূপণ করত এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, কিন্তু সাম্প্রতিক দু’দশকে প্রায় শূন্য বা বিরল হয়ে পড়েছে সেই অতি স্বাভাবিক জলমগ্নতা।

এমতাবস্থায়, উজান দেশের ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন সুর। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) লোকসভা সদস্য নিশিকান্ত দুবে অভিযোগ করেছেন যে, অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশকে দেওয়ায় ভারতের কৃষকরা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। হতে পারে এটি নিছক কথার চাল, অথবা নয়াদিল্লির নীরব অবস্থানের প্রতিফলন। বিষয়টি বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারবেন, বিশেষ করে যখন ভারতীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হবে।

তবে দুবের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতি ভারতের পুরোনো আধিপত্যবাদী মনোভাবের ইঙ্গিতবাহী। সেই মানসিকতায় নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ অনুযায়ী পানি বা জল পাওয়া নিম্ন অববাহিকার দেশটির ন্যায্য অধিকারকে স্বীকার করা হয় না। সম্প্রতি এক্সে (সাবেক টুইটার) তার একাধিকবার লেখা প্রশ্নবোধক চিহ্নে বিবৃতিমূলক বাক্য—‘পানি বাংলাদেশে চলে যায়?’—এমন ধারণা দেয় যেন আন্তঃসীমান্ত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অন্যায্য বা অস্বাভাবিক। নিজের দেশেরও কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রধানত দুটি নদীর পানিবণ্টন-সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন এই আইনপ্রণেতা। তার দাবি, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে নদীর পানি ভাগাভাগি করা হয়েছে ভারতের নিজস্ব প্রয়োজন না মিটিয়েই।’

সবাই জানে, এই ভারতীয় ভদ্রলোকের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কয়েক দশক ধরে গঙ্গা ছাড়া প্রায় সব আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি একতরফাভাবেই প্রত্যাহার করে এসেছে ভারত। ভারত থেকে বা ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবাহিত হওয়া নদ-নদীর সংখ্যা ৫৪টি। এসব নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সমস্যা তৈরি করেছে।