ঢাকা ১২:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের দায়িত্ব ও গুরুত্ব

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি মাইলফলক। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ আবার এই বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ আসনে বসার গৌরব অর্জন করলো।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) কী?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে ‘বিশ্বের সংসদ’ বা পার্লামেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। জাতিসংঘের মোট ৬টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ পরিষদ সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র অঙ্গ যেখানে জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র অর্থাৎ ১৯৩টি দেশ সমান প্রতিনিধিত্ব পায়।
নিরাপত্তা পরিষদে যেমন ৫টি দেশের ‘ভেটো’ দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা থাকে, সাধারণ পরিষদে তেমন কোনও বৈষম্য নেই। এখানে আমেরিকা হোক বা কোনও ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র— সবার ভোটের মূল্য সমান (১টি দেশ, ১টি ভোট)। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে এর মূল বার্ষিক অধিবেশন বসে, যেখানে বিশ্বের সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এসে বক্তব্য দেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কী?
সাধারণ পরিষদের সভাপতি (পিজিএ) পদটিকে বলা হয় জাতিসংঘের অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক পদ। এক বছরের জন্য নির্বাচিত এই সভাপতির প্রধান কাজগুলো হলো—
অধিবেশন পরিচালনা: সাধারণ পরিষদের সব বৈঠক ও বিতর্ক নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করা।
সমন্বয় ও মধ্যস্থতা: বিশ্বের বিভিন্ন সংকট বা এজেন্ডা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং ভোটাভুটির নেতৃত্ব দেওয়া।
বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব: জাতিসংঘের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নেওয়া এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করা।
খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়ায় লাভ কী?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের যেসব লাভ হবে—
কূটনৈতিক মর্যাদা: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব বেড়ে যাবে। ১৯৩টি দেশের নীতি নির্ধারণী আলোচনায় বাংলাদেশ কেন্দ্রে থাকবে।
বড় সংকট উত্থাপন: বাংলাদেশ চাইলে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মতো নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে বিশ্বমঞ্চের মূল আলোচনায় নিয়ে আসতে পারবে।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ: সভাপতি হিসেবে তিনি বিশ্বের শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনীতিবিদদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাবেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
সভাপতি হিসেবে তিনি কী কী সুবিধা বা প্রটোকল পাবেন?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সমমানের প্রটোকল ও সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে—
জাতিসংঘের সদরদফতরে স্থায়ী অফিস: নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের মূল ভবনে তার জন্য একটি বিশেষায়িত ও সুসজ্জিত অফিস এবং নিজস্ব কূটনৈতিক স্টাফ বা সচিবালয় থাকবে।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও আবাসন: নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ স্তরের প্রটোকল, কূটনৈতিক গাড়ি এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।
বিশ্ব সফর: দায়িত্ব পালনকালে তিনি জাতিসংঘের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন এবং সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় ভূষিত হবেন।
প্রসঙ্গত, এটি জাতিসংঘের একটি অনারারি বা সম্মানসূচক রাজনৈতিক পদ। সভাপতি যেহেতু কোনও একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন, তাই তার মূল বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ভার সাধারণত তার নিজের দেশ (এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার) বহন করে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে ৪০ বছর আগে বাংলাদেশের হয়ে এই গৌরব এনেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তার সেই সভাপতিত্বের সময়েই জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা সরকারিভাবে ব্যবহারের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতে তৎকালীন শীতল যুদ্ধের আবহের মধ্যেও সফলভাবে অধিবেশন পরিচালনা করেছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাদি হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার নিয়ে বিস্ফোরক দাবি মমতার, ‘চুপ থাকতে বলেছিলেন অমিত শাহ’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের দায়িত্ব ও গুরুত্ব

আপডেট সময় : ১১:১২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি মাইলফলক। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ আবার এই বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ আসনে বসার গৌরব অর্জন করলো।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) কী?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে ‘বিশ্বের সংসদ’ বা পার্লামেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। জাতিসংঘের মোট ৬টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ পরিষদ সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র অঙ্গ যেখানে জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র অর্থাৎ ১৯৩টি দেশ সমান প্রতিনিধিত্ব পায়।
নিরাপত্তা পরিষদে যেমন ৫টি দেশের ‘ভেটো’ দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা থাকে, সাধারণ পরিষদে তেমন কোনও বৈষম্য নেই। এখানে আমেরিকা হোক বা কোনও ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র— সবার ভোটের মূল্য সমান (১টি দেশ, ১টি ভোট)। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে এর মূল বার্ষিক অধিবেশন বসে, যেখানে বিশ্বের সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এসে বক্তব্য দেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কী?
সাধারণ পরিষদের সভাপতি (পিজিএ) পদটিকে বলা হয় জাতিসংঘের অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক পদ। এক বছরের জন্য নির্বাচিত এই সভাপতির প্রধান কাজগুলো হলো—
অধিবেশন পরিচালনা: সাধারণ পরিষদের সব বৈঠক ও বিতর্ক নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করা।
সমন্বয় ও মধ্যস্থতা: বিশ্বের বিভিন্ন সংকট বা এজেন্ডা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং ভোটাভুটির নেতৃত্ব দেওয়া।
বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব: জাতিসংঘের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নেওয়া এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করা।
খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়ায় লাভ কী?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের যেসব লাভ হবে—
কূটনৈতিক মর্যাদা: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব বেড়ে যাবে। ১৯৩টি দেশের নীতি নির্ধারণী আলোচনায় বাংলাদেশ কেন্দ্রে থাকবে।
বড় সংকট উত্থাপন: বাংলাদেশ চাইলে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মতো নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে বিশ্বমঞ্চের মূল আলোচনায় নিয়ে আসতে পারবে।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ: সভাপতি হিসেবে তিনি বিশ্বের শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনীতিবিদদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাবেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
সভাপতি হিসেবে তিনি কী কী সুবিধা বা প্রটোকল পাবেন?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সমমানের প্রটোকল ও সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে—
জাতিসংঘের সদরদফতরে স্থায়ী অফিস: নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের মূল ভবনে তার জন্য একটি বিশেষায়িত ও সুসজ্জিত অফিস এবং নিজস্ব কূটনৈতিক স্টাফ বা সচিবালয় থাকবে।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও আবাসন: নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ স্তরের প্রটোকল, কূটনৈতিক গাড়ি এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।
বিশ্ব সফর: দায়িত্ব পালনকালে তিনি জাতিসংঘের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন এবং সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় ভূষিত হবেন।
প্রসঙ্গত, এটি জাতিসংঘের একটি অনারারি বা সম্মানসূচক রাজনৈতিক পদ। সভাপতি যেহেতু কোনও একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন, তাই তার মূল বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ভার সাধারণত তার নিজের দেশ (এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার) বহন করে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে ৪০ বছর আগে বাংলাদেশের হয়ে এই গৌরব এনেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তার সেই সভাপতিত্বের সময়েই জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা সরকারিভাবে ব্যবহারের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতে তৎকালীন শীতল যুদ্ধের আবহের মধ্যেও সফলভাবে অধিবেশন পরিচালনা করেছিলেন।