সিলেটে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাধারণত শিশুদের রোগ হিসেবে পরিচিত হাম এবার কিশোর, তরুণ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা চিকিৎসকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে শিশুদের পাশাপাশি ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি হামের উপসর্গ নিয়ে ২২ বছর বয়সী এক মিডওয়াইফের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যান ২২ বছর বয়সী মিডওয়াইফ জেরিন সুলতানা, যা চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সিলেটের শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে বর্তমানে শিশুদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালটির চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই পাঁচ থেকে ১২ জন পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। যদিও তাদের অধিকাংশই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠছেন, তবুও এই বয়সীদের মধ্যে হামের বিস্তার অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাম সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও এবার ১৫, ১৮, ২০ কিংবা ২২ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাদের অনেকেই জানেন না ছোটবেলায় হাম প্রতিরোধী টিকা নিয়েছিলেন কি না, কিংবা তাদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে কি না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৬৭ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ২৬৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১৬৫ জনের শরীরে পরীক্ষাগারে হাম শনাক্ত হয়েছে।
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের পাশাপাশি তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীরাও চিকিৎসা নিচ্ছেন। কারও হাতে স্যালাইন চলছে, কেউ আবার দীর্ঘদিনের জ্বর ও দুর্বলতায় ভুগছেন। অনেকের শরীরে র্যাশ দেখা দিয়েছে, আবার কেউ তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ৩৪ বছর বয়সী শাকবীর মিয়া জানান, প্রথমে তার জ্বর হয়। পরে শরীরে দাগ দেখা দিলে চিকিৎসক হাম শনাক্ত করেন। কয়েকদিন বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়ার পর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
অন্যদিকে ১৮ বছর বয়সী মোস্তাকিম এবং তরুণ অনিক রায়ের মতো রোগীরাও একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, জ্বরের পর শরীরে র্যাশ দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
চিকিৎসক এস এম সাজ্জাদুল হক জানিয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে জ্বর, র্যাশ ও কাশির পাশাপাশি তীব্র ডায়রিয়া বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে বমি, পেটব্যথা এমনকি মলদ্বার দিয়ে রক্তক্ষরণের মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে। তার মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৯০ শতাংশই ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে আসছেন।
অন্যদিকে শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জটিলতা হয়ে উঠছে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুদের অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে নিউমোনিয়া। ফলে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হচ্ছে।
শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত ১৭০ থেকে ১৮০ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ ও বয়স্ক। তাদের মধ্যে একজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, হামের বিস্তার রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। জ্বর দেখা দিলে বাইরে চলাফেরা না করে নিজেকে আলাদা রাখতে হবে। একইসঙ্গে শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ হাম প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। অন্যথায় শিশুদের পাশাপাশি তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
রিপোর্টারের নাম 

























