দেশে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাসের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের মূল্য বাড়তে পারে এবং নতুন দর চলতি জুন মাস থেকেই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের একটি বিতর্কিত বিষয়—‘সিস্টেম লস’ বা পদ্ধতিগত ক্ষতি। অনেক বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ কি উৎপাদন ব্যয়, নাকি অপচয়, চুরি ও দুর্নীতির দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইতোমধ্যে বিদ্যুতের নতুন মূল্য নির্ধারণের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিভিন্ন শর্ত এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলার যুক্তিতে এই মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বস্তির খবর হলো, আপাতত ‘লাইফ লাইন’ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা আগের হারেই বিল দিতে পারবেন।
এদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। বিইআরসির কারিগরি কমিটি গড়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। কমিশনের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, এক টাকার কম বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশকে বাড়তি ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
তবে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যে কারণ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, সেটি হলো বিদ্যুৎ খাতের তথাকথিত ‘সিস্টেম লস’। বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র থেকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর পথে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ হারিয়ে যায় বা হিসাবের বাইরে চলে যায়, তাকে সিস্টেম লস বলা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, এই ক্ষতির বড় অংশ প্রকৃত কারিগরি ত্রুটি নয়; বরং অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি, বিল জালিয়াতি এবং বিদ্যুৎ চুরির ফল।
তাদের মতে, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে সিস্টেম লস সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে বাংলাদেশে এটি ১০ শতাংশেরও বেশি। এই বিশাল ব্যবধান কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ চুরি এবং অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দৈনিক লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চেষ্টা করা হয়, তার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, লাইনম্যান এবং স্থানীয় দালালচক্রের যোগসাজশে বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগ বছরের পর বছর চালু রয়েছে।
বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রি-রোলিং মিল, বস্ত্রকল, রং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে মিটার কারসাজির অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ উপায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বলে সমালোচকরা মনে করেন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গত অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার পরও লোকসান থেকে বের হতে পারেনি। ভর্তুকি গ্রহণের পরও প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি লোকসান হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর ভর্তুকি, মূল্যবৃদ্ধি এবং নানা সংস্কার উদ্যোগের পরও কেন এই লোকসান কমছে না।
সমালোচকদের মতে, শুধু বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মিটার জালিয়াতি বন্ধ করা, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। তাদের বড় একটি অংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত। খাদ্যপণ্য, পরিবহন, গ্যাস ও অন্যান্য সেবার মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যে বিদ্যুতের নতুন মূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব শিল্প উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে হলে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহি এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর সিস্টেম লস ও লোকসানের অজুহাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না, বরং খাতটির সংকট আরও গভীর হবে।
রিপোর্টারের নাম 






















