ঢাকা ০৩:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬

বিদ্যুতের দাম বাড়ছে ১৮-২২ শতাংশ, জুন থেকেই বাড়তি বিলের শঙ্কা

দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ১৯ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে। সব ধরনের গ্রাহক—গৃহস্থালি, সেচ, শিল্প, বাণিজ্যিক ও লাইফলাইন সংযোগ—এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায় আসতে পারে। নতুন দর কার্যকর হলে আগামী জুন মাস থেকেই গ্রাহকদের বাড়তি বিল পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুতের নতুন মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত আদেশ জারির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। কমিশন চাইছে দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে। যদিও দাম বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট হার নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উল্লেখযোগ্য হারে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে জানা গেছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে দ্রুত আদেশ জারি করা হবে। তবে তিনি মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা একাধিক কারণে রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে অল্প সময়ের মধ্যে শুনানি শেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নজির তৈরি হবে, অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে একসঙ্গে এত বেশি হারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘটনা অতীতে খুব কম দেখা গেছে। এর আগে ২০১১ সালে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

এবারের প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুতগতির। গত ২০ ও ২১ মে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কার্যত মাত্র দুই কর্মদিবসের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত প্রস্তুতের কাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে এত অল্প সময়ে মূল্যবৃদ্ধির আদেশ জারির বিষয়টি নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১২ টাকা ৯১ পয়সা। বর্তমান দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে বিপিডিবির বিপুল আর্থিক ঘাটতি তৈরি হবে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতের অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক মনে করেন, দুর্নীতি, অস্বচ্ছ চুক্তি, অতিরিক্ত সক্ষমতা খরচ এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোও লোকসানের কথা উল্লেখ করে মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি (ডেসকো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এবং অন্যান্য বিতরণ সংস্থা দাবি করেছে, পাইকারি বিদ্যুতের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে তাদের আর্থিক ক্ষতি ক্রমাগত বাড়ছে।

ডেসকোর হিসাবে, গত কয়েক বছরে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়লেও গ্রাহক পর্যায়ে বৃদ্ধি হয়েছে তুলনামূলক কম। এতে প্রতিষ্ঠানটির কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। একই ধরনের যুক্তি দিয়েছে ডিপিডিসি ও আরইবিও। আরইবির দাবি, শুধু চলতি অর্থবছরেই তাদের সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

এদিকে বিদ্যুতের সঞ্চালন ব্যয়ও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের একমাত্র সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর আবেদন করেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সঞ্চালন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম ১৮ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলে তা শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প উৎপাদন ব্যয়, সেচ খরচ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকট সমাধানে শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, উৎপাদন ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। অন্যথায় বারবার মূল্যবৃদ্ধি করেও খাতটির কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অস্বাভাবিক অপরাধের সয়লাব: আমরা কি তবে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলছি?

বিদ্যুতের দাম বাড়ছে ১৮-২২ শতাংশ, জুন থেকেই বাড়তি বিলের শঙ্কা

আপডেট সময় : ০২:৪১:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ১৯ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে। সব ধরনের গ্রাহক—গৃহস্থালি, সেচ, শিল্প, বাণিজ্যিক ও লাইফলাইন সংযোগ—এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায় আসতে পারে। নতুন দর কার্যকর হলে আগামী জুন মাস থেকেই গ্রাহকদের বাড়তি বিল পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুতের নতুন মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত আদেশ জারির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। কমিশন চাইছে দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে। যদিও দাম বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট হার নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উল্লেখযোগ্য হারে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে জানা গেছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে দ্রুত আদেশ জারি করা হবে। তবে তিনি মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা একাধিক কারণে রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে অল্প সময়ের মধ্যে শুনানি শেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নজির তৈরি হবে, অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে একসঙ্গে এত বেশি হারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘটনা অতীতে খুব কম দেখা গেছে। এর আগে ২০১১ সালে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

এবারের প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুতগতির। গত ২০ ও ২১ মে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কার্যত মাত্র দুই কর্মদিবসের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত প্রস্তুতের কাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে এত অল্প সময়ে মূল্যবৃদ্ধির আদেশ জারির বিষয়টি নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১২ টাকা ৯১ পয়সা। বর্তমান দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে বিপিডিবির বিপুল আর্থিক ঘাটতি তৈরি হবে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতের অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক মনে করেন, দুর্নীতি, অস্বচ্ছ চুক্তি, অতিরিক্ত সক্ষমতা খরচ এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোও লোকসানের কথা উল্লেখ করে মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি (ডেসকো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এবং অন্যান্য বিতরণ সংস্থা দাবি করেছে, পাইকারি বিদ্যুতের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে তাদের আর্থিক ক্ষতি ক্রমাগত বাড়ছে।

ডেসকোর হিসাবে, গত কয়েক বছরে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়লেও গ্রাহক পর্যায়ে বৃদ্ধি হয়েছে তুলনামূলক কম। এতে প্রতিষ্ঠানটির কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। একই ধরনের যুক্তি দিয়েছে ডিপিডিসি ও আরইবিও। আরইবির দাবি, শুধু চলতি অর্থবছরেই তাদের সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

এদিকে বিদ্যুতের সঞ্চালন ব্যয়ও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের একমাত্র সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর আবেদন করেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সঞ্চালন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম ১৮ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলে তা শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প উৎপাদন ব্যয়, সেচ খরচ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকট সমাধানে শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, উৎপাদন ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। অন্যথায় বারবার মূল্যবৃদ্ধি করেও খাতটির কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হবে।