পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে লাখো মানুষ এখন গ্রামের অভিমুখে ছুটছেন; তবে এই আনন্দযাত্রার ভিড়ে শিশুদের মধ্যে মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রকোপ আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে তীব্র শঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, হামে আক্রান্ত কোনো শিশু বাইরে বের হলে বা রাস্তায় থাকলে তার মাধ্যমে আশেপাশের অসংখ্য শিশুর মধ্যে এই বিপজ্জনক জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো শিশুর শরীরে হামের ন্যূনতম উপসর্গ বা লক্ষণ থাকলে, তাকে নিয়ে এই ঈদযাত্রায় বের না হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে রেকর্ড ৬৬ হাজার শিশু চিকিৎসা নিয়েছে এবং এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে সাড়ে পাঁচশ ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মঙ্গলবারও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩ হাজার ৯৬৬ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল। হামের এই ভয়াবহ প্রকোপ মোকাবিলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও, প্রতিনিয়ত আশঙ্কাজনক হারে শিশু মৃত্যুর খবরে দেশজুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে কোটি মানুষের এই ঈদযাত্রার প্রাক্কালে সরকারের পক্ষ থেকে হামের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো সতর্কবার্তা বা গাইডলাইন জারি না করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই সমালোচনাকে নাকচ করে দাবি করেছে যে, হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সচেতনতামূলক প্রচার তারা ‘অনেক আগে থেকেই’ করে আসছে। ঈদযাত্রার এই বিশেষ সময়ে আলাদা কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, কারণ তাদের মতে, এতে সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ধারণা অনুযায়ী, এবার ঈদ উদযাপন করতে প্রায় ১ কোটি থেকে ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষ রাজধানী ঢাকা ছাড়বেন। আর হামের ভাইরাস যেহেতু হাঁচি, কাশি বা প্রত্যক্ষ সংস্পর্শের মাধ্যমে অতি দ্রুত ছড়ায় এবং সংক্রমণের পর শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পেতে ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সময় নেয়, সেহেতু এই গিজগিজে ঈদযাত্রার পথে শিশুদের মধ্যে এই রোগের বিস্তার ব্যাপক হারে বাড়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
হাম মোকাবিলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মূল অংশ গত ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে শেষ হয়েছে এবং এই কর্মসূচির আওতায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্থাৎ ১ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে সফলভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে যেসব শিশু এখনো কোনো কারণে টিকা পায়নি, তাদের সুরক্ষায় টিকাদান কার্যক্রম এখনো সচল রাখা হয়েছে। ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম প্রপ্রসঙ্গটি টেনে বলেন, হামের টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হতে অন্তত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তাই টিকা নেওয়ার পরও প্রায় এক মাস শিশুদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আইসোলেশনে বা নিরাপদে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু গত ২০ মে টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় দেশজুড়ে ঈদযাত্রার উপচে পড়া ভিড় শুরু হয়েছে। ফলে হামের সংক্রমণ নতুন করে বৃদ্ধির শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে জানিয়ে এই জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক মনে করেন, দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবার মানুষের ঈদযাত্রা কিছুটা স্বল্প পরিসরে হওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল।
ঈদযাত্রার ঠিক আগে হামের মতো একটি মারাত্মক মহামারি পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা জারি না করাকে স্পষ্ট ‘উদাসীনতা’ হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ঈদের এই ব্যাপক গণ-চলাচলের কারণে হামের সংক্রমণ বহুগুণ বাড়তে পারে, কারণ অসংখ্য মানুষ এখন গ্রামে যাচ্ছেন। এর ফলে প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে সুস্থ শিশুরা যেমন হামে আক্রান্ত হতে পারে, তেমনি ঢাকা থেকে আক্রান্ত কোনো শিশু গ্রামে গিয়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। ঢাকার বাইরে সেভাবে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও অনেক বেশি বলে তিনি সতর্ক করেন। তাছাড়া শুরুর দিকে শিশুদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা কিছুটা কম থাকে জানিয়ে জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, মায়ের দুধ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডিগুলো শিশুর জীবনের শুরুর দিকে টিকার কার্যকারিতায় কিছুটা বাধার সৃষ্টি করে। এ কারণেই মূলত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হামের টিকার কার্যকারিতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়; যেমন শিশুর বয়স ৬ মাসে টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৫০ শতাংশ, ৯ মাসে প্রায় ৮৫ শতাংশ, ১২ মাসে প্রায় ৯০ শতাংশ, ১৫ মাসের বেশি বয়সে প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ৪-৬ বছর অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক স্কুলগামী বয়সে এটি সর্বোচ্চ ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
সাধারণত শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে হামের দৃশ্যমান লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র উচ্চ জ্বর, অনবরত সর্দি ও কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া, সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ওঠা এবং মুখের ভেতরের অংশে ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দেওয়া। এই ফুসকুড়ি সাধারণত মুখমণ্ডল থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় অসাবধানতার কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের গুরুতর সংক্রমণ কিংবা মস্তিষ্কের মারাত্মক প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো অত্যন্ত জটিল উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা শিশুর মৃত্যুঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যেহেতু হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, তাই আক্রান্ত শিশুকে সাধারণত পূর্ণ বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল বা পানি, পুষ্টিকর খাবার এবং জ্বর নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করা হয়।
হামের যেকোনো ধরনের উপসর্গ ও লক্ষণ থাকা শিশুদের এই উৎসবের সময়ে বাধ্যতামূলকভাবে বাড়িতে রাখার জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদের এই সময়ে শহরের শিশুরা গ্রামে গিয়ে নতুন করে হামে আক্রান্ত হতে পারে, আবার ঢাকা থেকে সংক্রমিত কোনো শিশু গ্রামে গিয়ে স্থানীয় শিশুদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিতে পারে। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে দেশে হাম সংক্রমণের যে সর্বোচ্চ বা ‘পিক’ পর্যায় চলছে, তা আরও দীর্ঘায়িত ও প্রলম্বিত হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন, হামের লক্ষণ আছে এমন শিশুদের সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে, বারবার হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং হাঁচি-কাশির সময় কঠোর সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে; এককথায় যত বেশি সম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট জানান, ঈদের এই মৌসুমে হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের নিয়ে কোনো অবস্থাতেই বাইরে বা কোথাও যাওয়া উচিত নয়, কারণ হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও সংক্রামক রোগ, যা সুস্থ শিশুদের মধ্যে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ঈদযাত্রার এই মহাব্যস্ত মৌসুমে হাম নিয়ে আলাদা করে কোনো গাইডলাইন বা নির্দেশনা জারি না করার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, তারা হাম মোকাবিলায় ঈদের ছুটির মধ্যেও দেশের প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নির্দেশনা জারি করে রেখেছেন এবং অনেক আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন সচেতনতামূলক বিষয় নিয়মিত প্রচার করছেন। তবে বর্তমান ঈদযাত্রার বিষয়ে সরাসরি কোনো বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, কারণ এতে সাধারণ মানুষের মাঝে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারত। মহাপরিচালক জোরালো দাবি করেন যে, হামের লক্ষণ থাকলে যতটা সম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হয়—এই সাধারণ বিষয়টি ‘দেশের প্রায় সব মানুষই’ ভালোমতো জানেন। কিন্তু এই সব স্বাস্থ্যবিধি জানার পরও যদি মানুষ তা স্বেচ্ছায় উপেক্ষা করে অবহেলা দেখায়, তবে পরিস্থিতি মারাত্মক খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
রিপোর্টারের নাম 

























