ঢাকা ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

প্রতিদিন ডুবে মারা যাচ্ছে ৩০ শিশুর বেশি, তবুও নীরব সরকার

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু এখন এক ভয়াবহ কিন্তু উপেক্ষিত জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এটি একটি “ন্যাশনাল সাইলেন্ট কিলার”, অথচ এখনো বিষয়টি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ বলছে, দেশে প্রতিদিন ৩০ জনের বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, যাদের বেশিরভাগের বয়স পাঁচ বছরের কম। ২০২৪ সালের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, এর মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু। অর্থাৎ ডুবে মৃত্যুর ৭৫ শতাংশের বেশি শিশুদের। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা এবং সব ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে বাড়ির পাশের পুকুরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হারে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।

নরসিংদীর মনোহরদীর নাসিমা বেগমের মতো অসংখ্য মা আজও সন্তানের মৃত্যু ভুলতে পারেননি। তার আট বছরের ছেলে সিফাত তালুকদার শৈবাল স্কুল থেকে ফিরে অন্য শিশুদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে ডুবে মারা যায়। এমন ঘটনা এখন গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিদিনের বাস্তবতা। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ শিশু পরিবারের অগোচরে বাড়ির পাশের জলাশয়ে পড়ে মারা যায় এবং তাদের বড় অংশই সাঁতার জানে না। শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ইউনিসেফের সাবেক কর্মকর্তা মুনিরা হাসান বলেছেন, সাঁতারকে দেশে “বেসিক লাইফ স্কিল” হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তার মতে, স্কুল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক সাঁতার শিক্ষা চালু করলে হাজারো শিশুর জীবন রক্ষা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, সরকার ও সমাজ যদি এটিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ দিয়ে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।

ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করা সিআইপিআরবি-এর গবেষক আল আমিন ভূইয়া বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। তার মতে, বিষয়টি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত কাঠামো দরকার। যদিও সরকার ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্র’ প্রকল্প নিয়েছিল এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘পানিতে ডুবা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল’ প্রণয়ন করেছে, তবে বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন বলেছেন, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং শিশুদের ডুবে মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনাই লক্ষ্য। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি জানিয়েছেন, ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে একটি জাতীয় স্ট্র্যাটেজি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন না বিষয়টি জাতীয় জরুরি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, ততদিন এই “নীরব মহামারি” থামানো কঠিন হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণহত্যার বিচারে মন্থর গতি: বিচারপ্রার্থী ও শহীদ পরিবারে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রতিদিন ডুবে মারা যাচ্ছে ৩০ শিশুর বেশি, তবুও নীরব সরকার

আপডেট সময় : ০৩:৩১:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু এখন এক ভয়াবহ কিন্তু উপেক্ষিত জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এটি একটি “ন্যাশনাল সাইলেন্ট কিলার”, অথচ এখনো বিষয়টি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ বলছে, দেশে প্রতিদিন ৩০ জনের বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, যাদের বেশিরভাগের বয়স পাঁচ বছরের কম। ২০২৪ সালের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, এর মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু। অর্থাৎ ডুবে মৃত্যুর ৭৫ শতাংশের বেশি শিশুদের। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা এবং সব ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে বাড়ির পাশের পুকুরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হারে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।

নরসিংদীর মনোহরদীর নাসিমা বেগমের মতো অসংখ্য মা আজও সন্তানের মৃত্যু ভুলতে পারেননি। তার আট বছরের ছেলে সিফাত তালুকদার শৈবাল স্কুল থেকে ফিরে অন্য শিশুদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে ডুবে মারা যায়। এমন ঘটনা এখন গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিদিনের বাস্তবতা। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ শিশু পরিবারের অগোচরে বাড়ির পাশের জলাশয়ে পড়ে মারা যায় এবং তাদের বড় অংশই সাঁতার জানে না। শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ইউনিসেফের সাবেক কর্মকর্তা মুনিরা হাসান বলেছেন, সাঁতারকে দেশে “বেসিক লাইফ স্কিল” হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তার মতে, স্কুল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক সাঁতার শিক্ষা চালু করলে হাজারো শিশুর জীবন রক্ষা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, সরকার ও সমাজ যদি এটিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ দিয়ে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।

ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করা সিআইপিআরবি-এর গবেষক আল আমিন ভূইয়া বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। তার মতে, বিষয়টি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত কাঠামো দরকার। যদিও সরকার ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্র’ প্রকল্প নিয়েছিল এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘পানিতে ডুবা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল’ প্রণয়ন করেছে, তবে বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন বলেছেন, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং শিশুদের ডুবে মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনাই লক্ষ্য। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি জানিয়েছেন, ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে একটি জাতীয় স্ট্র্যাটেজি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন না বিষয়টি জাতীয় জরুরি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, ততদিন এই “নীরব মহামারি” থামানো কঠিন হবে।