ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

‘জনগণমন’ ও রবীন্দ্র-বিরোধিতা: ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যায় ধন্বন্তরি মলম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম শুনলেই যাদের শরীরে ও মনে এক ধরনের অস্বস্তি বা ‘চুলকানি’ দেখা দেয়, তাদের উদ্দেশে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ জরুরি। রবীন্দ্রনাথকে যারা কাঁকড়াবিছা বা বিছুটি পাতার আঘাতের মতো মনে করেন, তাদের ঘুণ ধরা চিন্তার জগৎকে নাড়া দিতে এই প্রবন্ধ। এই ‘চুলকানি’র সঠিক রোগ নির্ণয় করে তার জন্য একটি ‘ধন্বন্তরি মলম’ ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের একটি প্রধান লক্ষণ হলো, তারা অভিযোগ করেন যে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশদের তোষামোদ করে নোবেল পেয়েছেন। তাদের দাবি, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রিটিশদের গোলাম এবং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের রাজ্যাভিষেক ও ভারতের দরবারে আগমন উপলক্ষে তিনি ‘জনগণমন’ বা ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গানটি লেখেন।

তবে ঐতিহাসিক তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর কংগ্রেস নতুন রাজাকে সংবর্ধনা জানিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে পঞ্চম জর্জের সম্মানে গান পরিবেশিত হলেও, সেখানে ‘জনগণমন’ গাওয়া হয়নি। দিল্লির সেই সর্বভারতীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছিল রামভূজ চৌধুরী রচিত ‘বাদশা হামারা’ গানটি। রবীন্দ্রনাথের ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গানটি প্রকাশিত হয় ওই বছরই ২৭ ডিসেম্বর। এটি যদি রাজা জর্জকে উদ্দেশ্য করে লেখা হতো, তাহলে তিনি কেন ডেডলাইন পার করে ফেললেন? জর্জ বাবুকে তৈলমর্দনে জর্জরিত করতে কেনই বা এত দেরি হতো?

আসলে রবীন্দ্রনাথ পঞ্চম জর্জকে মাথায় রেখে এই গান লেখেননি। তিনি নিজেই এ কথা বলেছেন। তবে তার কথা যদি নাও মানা হয়, গানটির একটি ‘সিটি স্ক্যান’ করা যাক। গানের একটি অংশে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত/ শুনি তব উদার বাণী/ হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক/ মুসলমান খৃস্টানী’। এটি ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির বিরুদ্ধে তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় লেখা এক প্রতিবাদ। সিপাহী বিদ্রোহের সুরও যেন অলক্ষ্যে বেজে উঠেছে এই লাইনটায়—’দারুণ বিপ্লব-মাঝে/ তব শঙ্খধ্বনি বাজে।’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইনটি হলো: ‘দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে স্নেহময়ী তুমি মাতা’। প্রবল পৌরুষের অহং নিয়ে সিংহের আসনে বসা পঞ্চম জর্জকে রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই ‘স্নেহময়ী মাতা’ বলতে পারেন? রবীন্দ্রনাথ সব সময় দেশকে মায়ের ছবিতে কল্পনা করেছেন। ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’—এই গানটির মতোই ‘জনগণমন’ আসলে ভারতমাতার বন্দনা, কোনো ব্রিটিশ রাজার গুণগান নয়। এই ভুল ব্যাখ্যার অবসান হওয়া জরুরি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরাইলি গোয়েন্দা প্রধানদের গোপন আমিরাত সফর: ইরান যুদ্ধের মধ্যে নতুন মেরুকরণ?

‘জনগণমন’ ও রবীন্দ্র-বিরোধিতা: ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যায় ধন্বন্তরি মলম

আপডেট সময় : ১১:২৫:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম শুনলেই যাদের শরীরে ও মনে এক ধরনের অস্বস্তি বা ‘চুলকানি’ দেখা দেয়, তাদের উদ্দেশে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ জরুরি। রবীন্দ্রনাথকে যারা কাঁকড়াবিছা বা বিছুটি পাতার আঘাতের মতো মনে করেন, তাদের ঘুণ ধরা চিন্তার জগৎকে নাড়া দিতে এই প্রবন্ধ। এই ‘চুলকানি’র সঠিক রোগ নির্ণয় করে তার জন্য একটি ‘ধন্বন্তরি মলম’ ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের একটি প্রধান লক্ষণ হলো, তারা অভিযোগ করেন যে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশদের তোষামোদ করে নোবেল পেয়েছেন। তাদের দাবি, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রিটিশদের গোলাম এবং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের রাজ্যাভিষেক ও ভারতের দরবারে আগমন উপলক্ষে তিনি ‘জনগণমন’ বা ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গানটি লেখেন।

তবে ঐতিহাসিক তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর কংগ্রেস নতুন রাজাকে সংবর্ধনা জানিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে পঞ্চম জর্জের সম্মানে গান পরিবেশিত হলেও, সেখানে ‘জনগণমন’ গাওয়া হয়নি। দিল্লির সেই সর্বভারতীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছিল রামভূজ চৌধুরী রচিত ‘বাদশা হামারা’ গানটি। রবীন্দ্রনাথের ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গানটি প্রকাশিত হয় ওই বছরই ২৭ ডিসেম্বর। এটি যদি রাজা জর্জকে উদ্দেশ্য করে লেখা হতো, তাহলে তিনি কেন ডেডলাইন পার করে ফেললেন? জর্জ বাবুকে তৈলমর্দনে জর্জরিত করতে কেনই বা এত দেরি হতো?

আসলে রবীন্দ্রনাথ পঞ্চম জর্জকে মাথায় রেখে এই গান লেখেননি। তিনি নিজেই এ কথা বলেছেন। তবে তার কথা যদি নাও মানা হয়, গানটির একটি ‘সিটি স্ক্যান’ করা যাক। গানের একটি অংশে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত/ শুনি তব উদার বাণী/ হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক/ মুসলমান খৃস্টানী’। এটি ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির বিরুদ্ধে তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় লেখা এক প্রতিবাদ। সিপাহী বিদ্রোহের সুরও যেন অলক্ষ্যে বেজে উঠেছে এই লাইনটায়—’দারুণ বিপ্লব-মাঝে/ তব শঙ্খধ্বনি বাজে।’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইনটি হলো: ‘দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে স্নেহময়ী তুমি মাতা’। প্রবল পৌরুষের অহং নিয়ে সিংহের আসনে বসা পঞ্চম জর্জকে রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই ‘স্নেহময়ী মাতা’ বলতে পারেন? রবীন্দ্রনাথ সব সময় দেশকে মায়ের ছবিতে কল্পনা করেছেন। ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’—এই গানটির মতোই ‘জনগণমন’ আসলে ভারতমাতার বন্দনা, কোনো ব্রিটিশ রাজার গুণগান নয়। এই ভুল ব্যাখ্যার অবসান হওয়া জরুরি।