রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের পশুর হাট কেন্দ্রিক অব্যবস্থাপনা আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ইজারা পাওয়ার কিংবা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন খেলার মাঠ এবং প্রধান সড়কগুলো দখলে নিতে শুরু করেছেন ইজারাদাররা। নিয়মানুযায়ী হাট শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে প্রস্তুতির অনুমতি থাকলেও, প্রভাবশালী ইজারাদাররা সেই শর্তকে তোয়াক্কা না করেই আগেভাগে হাটের কাঠামো নির্মাণ শুরু করে দিয়েছেন। এতে করে একদিকে যেমন ইজারার শর্তের চরম লঙ্ঘন হচ্ছে, অন্যদিকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট খেলার মাঠটি এই অনিয়মের এক বড় উদাহরণ। বিকেল গড়াতেই যে মাঠে শিশু-কিশোররা খেলাধুলায় মেতে উঠত, সেখানে এখন চলছে বাঁশ ও খুঁটি পোঁতার কাজ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এই মাঠটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেও সর্বোচ্চ দরদাতার সাথে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। অথচ সেই আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই মাঠটিতে খেলাধুলা বন্ধ করে দিয়ে হাটের প্রস্তুতি পুরোদমে চালানো হচ্ছে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আমুলিয়া এবং গ্রিন বনশ্রী হাউজিং এলাকাতেও। সেখানেও সর্বোচ্চ দরদাতা চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই ইজারার শর্ত ভেঙে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই মাঠ ও আশপাশের এলাকা দখলে নেওয়া হয়েছে।
এ বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫টি এবং দক্ষিণ সিটির ১১টি অস্থায়ী পশুর হাটের মধ্যে অধিকাংশেরই সর্বোচ্চ দরদাতা মিলেছে, তবে বাকিগুলোর টেন্ডার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ঢাকা শহরে এমনিতেই খেলার মাঠের প্রচণ্ড সংকট। এর ওপর যদি কোরবানির হাটের দোহাই দিয়ে দিনের পর দিন আগেভাগে মাঠগুলো দখল করে রাখা হয়, তবে শিশু-কিশোররা তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল খেলার মাঠগুলোকে এই তালিকার বাইরে রাখা, কিন্তু তারা প্রতি বছরই মাঠ বরাদ্দ দিচ্ছে এবং ইজারাদাররা সেই সুযোগে জনস্বার্থকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
এই বিশৃঙ্খলার বিষয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট সময়ের আগে কেউ হাট বসাতে না পারে। এমনকি হাটের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, তারা সাধারণত চার দিনের জন্য হাটের অনুমতি দেন। জনদুর্ভোগ কমানো, যানজট রোধ এবং হাটের বর্জ্য নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করার মতো কঠোর শর্ত মেনেই ইজারা দেওয়া হয়।
তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না ভুক্তভোগী নগরবাসী। তাদের মতে, প্রতি বছরই কাগজে-কলমে কঠোর নিয়মের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। অতীতে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইজারাদাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ফলে ইজারা পাওয়ার আগেই মাঠ ও সড়ক দখল এখন এক প্রকার নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
রিপোর্টারের নাম 























