ঢাকা ০৩:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬

জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির তোড়জোড়, বিপাকে সাধারণ গ্রাহক

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির মিছিলে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। জ্বালানি তেল এবং এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর এখন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রথম বিতরণ কোম্পানি হিসেবে নর্দান ইলেকট্রিসিটি কোম্পানি (নেসকো) খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দিয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট কোনো অংকের কথা উল্লেখ করা হয়নি, তবে পাইকারি দামের সাথে সমন্বয় করে খুচরা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে তারা।

বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, নেসকোর আবেদনের আগে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি ও খুচরা উভয় ক্ষেত্রেই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি আরও জানান যে, আগামীকালের মধ্যে অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিগুলোও তাদের প্রস্তাব জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব আবেদন পাওয়ার পর কমিশনের কারিগরি কমিটি সেগুলো যাচাই-বাছাই করবে এবং পরবর্তীতে গণশুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দাম নির্ধারণের বিধান করলেও অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় ‘বিইআরসি আইন ২০০৩’ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনে। গত ১৩ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত একটি মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত সোমবার পিডিবি বিদ্যুতের বাল্ক বা পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে পিডিবির খরচ হয় ১২ টাকা ৫০ পয়সা, অথচ তারা বিক্রি করে মাত্র ৭ টাকায়। এতে সরকারকে প্রতি ইউনিটে প্রায় সাড়ে ৫ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে এই খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও চলতি বছরে অতিরিক্ত আরও ২০ হাজার কোটি টাকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড় করাবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির চাপ সামলানো সম্ভব না হওয়ায় পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপে ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে শুরু করে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা পর্যন্ত ইউনিট প্রতি দাম নির্ধারিত রয়েছে। এর সাথে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মিটার ভাড়া যুক্ত হয়ে গ্রাহকের চূড়ান্ত বিল তৈরি হয়।

জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে এপ্রিল মাস থেকেই। গত ১৯ এপ্রিল ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দুই দফায় ৫৯৯ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়। এর পরপরই ১৮ এপ্রিল অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দামও লিটারপ্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে অকটেন ১৪০ টাকা ও ডিজেল ১১৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি ও গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর তা মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেসরকারি চাকরিজীবী ও সাধারণ ভোক্তাদের মতে, তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে বাজারের যে করুণ দশা হয়েছে, বিদ্যুতের বিল বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম এই পরিস্থিতিকে সাধারণ মানুষের ওপর ‘অবিচারের খড়গ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বিগত সরকারের অনিয়ম ও লুটপাটের দায়ভার বর্তমান সরকার ব্যয় না কমিয়ে সাধারণ জনগণের ওপর চাপাচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সংশোধনে দীর্ঘসূত্রতা ও দালালের দাপট: প্রশ্নবিদ্ধ এনআইডি সেবা

জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির তোড়জোড়, বিপাকে সাধারণ গ্রাহক

আপডেট সময় : ১১:৫৬:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির মিছিলে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। জ্বালানি তেল এবং এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর এখন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রথম বিতরণ কোম্পানি হিসেবে নর্দান ইলেকট্রিসিটি কোম্পানি (নেসকো) খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দিয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট কোনো অংকের কথা উল্লেখ করা হয়নি, তবে পাইকারি দামের সাথে সমন্বয় করে খুচরা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে তারা।

বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, নেসকোর আবেদনের আগে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি ও খুচরা উভয় ক্ষেত্রেই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি আরও জানান যে, আগামীকালের মধ্যে অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিগুলোও তাদের প্রস্তাব জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব আবেদন পাওয়ার পর কমিশনের কারিগরি কমিটি সেগুলো যাচাই-বাছাই করবে এবং পরবর্তীতে গণশুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দাম নির্ধারণের বিধান করলেও অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় ‘বিইআরসি আইন ২০০৩’ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনে। গত ১৩ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত একটি মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত সোমবার পিডিবি বিদ্যুতের বাল্ক বা পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে পিডিবির খরচ হয় ১২ টাকা ৫০ পয়সা, অথচ তারা বিক্রি করে মাত্র ৭ টাকায়। এতে সরকারকে প্রতি ইউনিটে প্রায় সাড়ে ৫ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে এই খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও চলতি বছরে অতিরিক্ত আরও ২০ হাজার কোটি টাকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড় করাবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির চাপ সামলানো সম্ভব না হওয়ায় পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপে ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে শুরু করে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা পর্যন্ত ইউনিট প্রতি দাম নির্ধারিত রয়েছে। এর সাথে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মিটার ভাড়া যুক্ত হয়ে গ্রাহকের চূড়ান্ত বিল তৈরি হয়।

জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে এপ্রিল মাস থেকেই। গত ১৯ এপ্রিল ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দুই দফায় ৫৯৯ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়। এর পরপরই ১৮ এপ্রিল অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দামও লিটারপ্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে অকটেন ১৪০ টাকা ও ডিজেল ১১৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি ও গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর তা মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেসরকারি চাকরিজীবী ও সাধারণ ভোক্তাদের মতে, তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে বাজারের যে করুণ দশা হয়েছে, বিদ্যুতের বিল বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম এই পরিস্থিতিকে সাধারণ মানুষের ওপর ‘অবিচারের খড়গ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বিগত সরকারের অনিয়ম ও লুটপাটের দায়ভার বর্তমান সরকার ব্যয় না কমিয়ে সাধারণ জনগণের ওপর চাপাচ্ছে।