ঢাকা ০৪:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬

ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের নতুন তৎপরতা

বাংলাদেশের সাথে বিদ্যমান স্থবিরতা কাটিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরায় সচল করতে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করছে ভারত। ঢাকার সাথে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যোগাযোগ আবার সক্রিয় করার লক্ষ্যে দেশটির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থমকে থাকা ৪০টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এসব প্রক্রিয়া সচল করতে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনাও শুরু হয়েছে। গত সোমবার নয়াদিল্লি সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এই তথ্য জানান। এ সময় তিনি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত থাকা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করেন।

পররাষ্ট্র সচিব তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পারস্পরিক যোগাযোগের গতি কিছুটা ধীর ছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে দুই দেশই যথেষ্ট আগ্রহী। উভয় দেশের জনগণের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংহতি বজায় রাখাকে ভারত তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যেকোনো সংকট কাটিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ভারত অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বিদ্যমান, তা ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, তিস্তা ইস্যু, শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন এবং সীমান্ত সমস্যাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, গত তিন দশকের এই চুক্তিটি অত্যন্ত কার্যকর ছিল এবং এটি যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমেই নবায়ন করা হবে। এছাড়া দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও সহযোগিতার বিষয়টি মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় এটি ভারতের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। যৌথ নদী কমিশন ও কারিগরি কমিটির মাধ্যমে এই আলোচনাগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে।

তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই বিষয়টি আটকে আছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে এতে কোনো গতি আসবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করে আলোচনার প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সাথে মিলিয়ে বড় করে দেখা ঠিক হবে না। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, পররাষ্ট্র সম্পর্ক নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ভারত বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সরকারসহ সব সরকারের সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে, যা একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগও তিনি নাকচ করে দেন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভারত সচেষ্ট এবং এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৫ সালে ব্যাংককে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন। সামগ্রিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, ভারত এখন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

তিস্তা চুক্তি: দীর্ঘ দেড় দশকের অচলাবস্থা নিরসনে নতুন আশার আলো

ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের নতুন তৎপরতা

আপডেট সময় : ১১:২৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

বাংলাদেশের সাথে বিদ্যমান স্থবিরতা কাটিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরায় সচল করতে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করছে ভারত। ঢাকার সাথে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যোগাযোগ আবার সক্রিয় করার লক্ষ্যে দেশটির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থমকে থাকা ৪০টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এসব প্রক্রিয়া সচল করতে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনাও শুরু হয়েছে। গত সোমবার নয়াদিল্লি সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এই তথ্য জানান। এ সময় তিনি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত থাকা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করেন।

পররাষ্ট্র সচিব তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পারস্পরিক যোগাযোগের গতি কিছুটা ধীর ছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে দুই দেশই যথেষ্ট আগ্রহী। উভয় দেশের জনগণের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংহতি বজায় রাখাকে ভারত তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যেকোনো সংকট কাটিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ভারত অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বিদ্যমান, তা ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, তিস্তা ইস্যু, শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন এবং সীমান্ত সমস্যাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, গত তিন দশকের এই চুক্তিটি অত্যন্ত কার্যকর ছিল এবং এটি যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমেই নবায়ন করা হবে। এছাড়া দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও সহযোগিতার বিষয়টি মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় এটি ভারতের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। যৌথ নদী কমিশন ও কারিগরি কমিটির মাধ্যমে এই আলোচনাগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে।

তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই বিষয়টি আটকে আছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে এতে কোনো গতি আসবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করে আলোচনার প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সাথে মিলিয়ে বড় করে দেখা ঠিক হবে না। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, পররাষ্ট্র সম্পর্ক নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ভারত বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সরকারসহ সব সরকারের সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে, যা একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগও তিনি নাকচ করে দেন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভারত সচেষ্ট এবং এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৫ সালে ব্যাংককে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন। সামগ্রিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, ভারত এখন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।