কক্সবাজারের পর্যটন নগরী এখন এক অভূতপূর্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বৈশাখের তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে ভয়াবহ লোডশেডিং—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে পর্যটন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র কক্সবাজার আজ পর্যটকশূন্য হওয়ার পথে। প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। সাধারণত বছরের এই সময়ে পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত থাকার কথা থাকলেও, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সৈকত ও হোটেলগুলোতে এখন কেবলই নিস্তব্ধতা।
পর্যটকদের জন্য হোটেল ও রিসোর্টগুলো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড় ঘোষণা করলেও তাতে তেমন কাজ হচ্ছে না। ঢাকা বা সাভারের মতো দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা অভিযোগ করছেন যে, দিনের ৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। জেনারেটর সুবিধা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা দিয়ে এসি চালানো সম্ভব হয় না, ফলে বদ্ধ রুমে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অনেকে ভ্রমণের আনন্দ মাটি হওয়ার ভয়ে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই হোটেল থেকে চেকআউট করে বাড়ির পথ ধরছেন। ইনানী বা মেরিন ড্রাইভের মতো নিরিবিলি এলাকাগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
হোটেল মালিকদের জন্য এই পরিস্থিতি এক মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। একদিকে পর্যটক নেই, অন্যদিকে সচল থাকা অল্প কিছু কক্ষের সেবা দিতে গিয়ে জেনারেটরের জ্বালানি বাবদ গুনতে হচ্ছে বিশাল অংকের টাকা। একটি মাঝারি মানের হোটেলেও প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ লিটার ডিজেল বাড়তি খরচ হচ্ছে, যা বর্তমান জ্বালানি মূল্যের বাজারে বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক হোটেল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালাতে গিয়ে কারিগরি জটিলতার মুখেও পড়ছেন।
এই সংকটের প্রভাব কেবল বড় হোটেলেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আঘাত হেনেছে একদম প্রান্তিক স্তরের ব্যবসায়ীদের ওপরও। পর্যটক না থাকায় সৈকতের কিটকট বা ছাতা ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন। বার্মিজ মার্কেট, ডাব বিক্রেতা, ট্যুরিস্ট জিপ এবং ইজিবাইক চালকদের আয় নেমে এসেছে অর্ধেকে বা তারও নিচে। সন্ধ্যার পর যখন বেচাকেনার মূল সময়, তখনই বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতারা দোকানে ঢুকছেন না, এমনকি ফ্রিজে রাখা পচনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছে।
সাধারণ জনজীবনেও এই লোডশেডিং হাহাকার তুলে দিয়েছে। উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া ও রামুসহ প্রতিটি উপজেলায় আধা ঘণ্টা অন্তর বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করছে। গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা—সবই এখন স্থবির। বিশেষ করে সামনে এসএসসি বা অন্যান্য পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সাররা ইন্টারনেটের ধীরগতি ও বিদ্যুতের অভাবে সময়মতো বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাজ জমা দিতে পারছেন না, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথকেও বাধাগ্রস্ত করছে। চিকিৎসা সেবাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, জরুরি অস্ত্রোপচার বা মুমূর্ষু রোগীদের সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতিই এই সংকটের মূলে। জেলায় প্রতিদিন ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও গড়ে পাওয়া যাচ্ছে তার অনেক কম। বিশেষ করে পর্যটন জোনে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন, তা না থাকায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিচ্ছে। তবে এই বিশাল ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা না গেলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প এক দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 




















