ঢাকা ০৯:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

অভ্যন্তরীণ পর্যটন ও টেকসই সমাধান: বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বিকাশ কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার এক অন্যতম হাতিয়ার। সুন্দরবন, কক্সবাজার, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে ভ্রমণে গিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, গত দুই দশকে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ও ‘ডিসপোজেবল ইনকাম’ বা বিবেচনাযোগ্য আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানি রডরিক এবং আচরণগত অর্থনীতির গবেষক রিচার্ড থেলারের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের আয় ও উৎসবের বোনাস বাড়লে তারা বিনোদন ও ভ্রমণে বেশি ব্যয় করতে আগ্রহী হন। এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে উৎসবকেন্দ্রিক সাশ্রয়ী প্যাকেজ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে দেশীয় পর্যটন শিল্প কয়েক গুণ বিকশিত হওয়া সম্ভব।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বেশ কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত বাধা দূর করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার অভাব, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং মানসম্মত শৌচাগার বা বিশ্রামাগারের অপ্রতুলতা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে কক্সবাজার ও সুন্দরবনের মতো এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটন শিল্প তখনই টেকসই হয় যখন চাহিদা ও সরবরাহ উভয়ই স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী থাকে। এই সমস্যা সমাধানে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ বা গুণিতক প্রভাব অত্যন্ত কার্যকর; কারণ পর্যটনে এক টাকা বিনিয়োগ করলে স্থানীয় অর্থনীতিতে তার ৩ থেকে ৪ গুণ মূল্য তৈরি হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সহজ বুকিং ব্যবস্থা, ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণকে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

টেকসই পর্যটনের জন্য ‘হোমস্টে’ পর্যটন, ইকো-লজ নির্মাণ এবং প্লাস্টিক ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বা গ্রামীণ অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুললে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করবে। সরকারের উচিত উৎসবকালীন বোনাস ও ছুটিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত ‘রুট ট্যুরিজম’ বা পথ-পর্যটনের ধারণা জনপ্রিয় করা। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে দেশভ্রমণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন বুকিং পোর্টাল চালু করা জরুরি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে যদি টেকসই পর্যটন নীতির সাথে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটিয়ে জাতীয় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনা এআই বিপজ্জনক: মেধা সম্পদ চুরির অভিযোগে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা জারি

অভ্যন্তরীণ পর্যটন ও টেকসই সমাধান: বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

আপডেট সময় : ০৭:০০:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বিকাশ কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার এক অন্যতম হাতিয়ার। সুন্দরবন, কক্সবাজার, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে ভ্রমণে গিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, গত দুই দশকে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ও ‘ডিসপোজেবল ইনকাম’ বা বিবেচনাযোগ্য আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানি রডরিক এবং আচরণগত অর্থনীতির গবেষক রিচার্ড থেলারের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের আয় ও উৎসবের বোনাস বাড়লে তারা বিনোদন ও ভ্রমণে বেশি ব্যয় করতে আগ্রহী হন। এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে উৎসবকেন্দ্রিক সাশ্রয়ী প্যাকেজ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে দেশীয় পর্যটন শিল্প কয়েক গুণ বিকশিত হওয়া সম্ভব।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বেশ কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত বাধা দূর করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার অভাব, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং মানসম্মত শৌচাগার বা বিশ্রামাগারের অপ্রতুলতা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে কক্সবাজার ও সুন্দরবনের মতো এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটন শিল্প তখনই টেকসই হয় যখন চাহিদা ও সরবরাহ উভয়ই স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী থাকে। এই সমস্যা সমাধানে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ বা গুণিতক প্রভাব অত্যন্ত কার্যকর; কারণ পর্যটনে এক টাকা বিনিয়োগ করলে স্থানীয় অর্থনীতিতে তার ৩ থেকে ৪ গুণ মূল্য তৈরি হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সহজ বুকিং ব্যবস্থা, ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণকে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

টেকসই পর্যটনের জন্য ‘হোমস্টে’ পর্যটন, ইকো-লজ নির্মাণ এবং প্লাস্টিক ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বা গ্রামীণ অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুললে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করবে। সরকারের উচিত উৎসবকালীন বোনাস ও ছুটিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত ‘রুট ট্যুরিজম’ বা পথ-পর্যটনের ধারণা জনপ্রিয় করা। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে দেশভ্রমণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন বুকিং পোর্টাল চালু করা জরুরি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে যদি টেকসই পর্যটন নীতির সাথে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটিয়ে জাতীয় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।