দেশের জনস্বাস্থ্য খাতে এক ভয়াবহ ও নীরব বিপর্যয় নেমে এসেছে, যার ফলে শিশুস্বাস্থ্যের দীর্ঘদিনের সুরক্ষা বলয় কার্যত ভেঙে পড়েছে। গাজীপুরের সাত বছরের সাদিয়ার মতো অসংখ্য শিশু এখন রাতকানা রোগের প্রাথমিক লক্ষণে ভুগছে, যারা আগে নিয়মিত সরকারের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেত। গত এক বছর ধরে স্কুলভিত্তিক এবং কমিউনিটি পর্যায়ের এই ক্যাম্পেইনগুলো বন্ধ থাকায় গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ও পুষ্টির ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একইভাবে ঝিনাইদহের রাব্বির মতো শিশুরা কৃমিজনিত অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতায় ভুগছে, কারণ জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এখন স্থবির। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) অচল হয়ে পড়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ওপি অচল থাকার অর্থ হলো—বাজেট থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক জটিলতা, ক্রয় প্রক্রিয়ার স্থবিরতা এবং মাঠপর্যায়ে লজিস্টিকস সরবরাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা একে পুরো স্বাস্থ্য সিস্টেমের ‘রক্তসঞ্চালন’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর সংকট হিসেবে দেখছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু হওয়া ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি এবং গত ২৭ বছরের কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ এক অনন্য সাফল্য অর্জন করেছিল। এর ফলে অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রায় নির্মূল হয়েছিল এবং কৃমি সংক্রমণের হার ৮০ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমে এসেছিল। বছরে দুইবার প্রায় ৪ কোটি শিশুকে এই সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনা হতো। তবে গত দুই বছরে এই ধারাবাহিকতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ক্যাপসুল বা ওষুধের সংকট নেই, বরং সেগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানোর পরিবহন ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবকদের ভাতা এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের ‘মেকানিজম’ কাজ করছে না। ব্যাংকে টাকা থাকলেও তা তোলার প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা ফাইন্যান্সিয়াল কোড সক্রিয় না থাকায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোনো ক্যাম্পেইন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক জায়গায় জনবল সংকট ও অফিস খরচ চালানোর মতো সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়গুলো।
এই স্থবিরতার ফলে সংক্রামক ব্যাধি ও অপুষ্টিজনিত রোগের পুনরুত্থানের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। শিশু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক ওষুধের কভারেজ বন্ধ থাকলে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হবে এবং রাতকানা রোগ মহামারি আকারে ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা কৃমি সংক্রমণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে, যা তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ও শিক্ষাগত সক্ষমতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির শক্তি হলো এর ধারাবাহিকতা; একবার এই চেইন ভেঙে গেলে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে অবিলম্বে অপারেশনাল প্ল্যান সক্রিয় করে লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা জরুরি। অন্যথায়, একটি পুরো প্রজন্মের মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দেশের জনস্বাস্থ্য খাত এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























