ঢাকা ০৬:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ীর যুদ্ধ: ভারতীয় বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ও বাংলাদেশের গৌরব

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ী সীমান্তে ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (তৎকালীন বিডিআর) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) উপর শোচনীয় বিজয় অর্জন করে। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

জানা যায়, ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে ভারতীয় কমান্ডো, সেনা ও বিএসএফের প্রায় ৪০০ সদস্যের একটি যৌথবাহিনী সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বড়াইবাড়ী এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। ভোরবেলা বোরো ধানক্ষেতে সেচ দিতে যাওয়া কৃষক মিনহাজ উদ্দিন শতাধিক বিএসএফ সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। তিনি কৌশলে তাদের ক্যাম্পের অবস্থান অন্যদিকে দেখিয়ে দ্রুত বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিডিআর) ক্যাম্পে খবর দেন।

খবর পেয়ে বিডিআর সদস্যরা তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং পাশের ইজলামারী ও খেওয়ারচর ক্যাম্পে সতর্কবার্তা পাঠান। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিএসএফ পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে বিডিআর ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। সংঘর্ষের শুরুতেই বিডিআরের ল্যান্স নায়েক ওয়াহিদুজ্জামান শহীদ হন। সকাল ১০টার দিকে জামালপুর ৩৩ রাইফেলসের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জামানের নেতৃত্বে বিডিআরের একটি বড় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে যুদ্ধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। দুই দিনব্যাপী এই যুদ্ধে বাংলাদেশ পক্ষের আরও দুই জোয়ান—সিপাহী আব্দুল কাদের ও সিপাহী মাহফুজুর রহমান শহীদ হন।

অন্যদিকে, এই যুদ্ধে ভারতীয় বিএসএফের ১৬ জন সদস্য নিহত হয় বলে জানা যায়, যদিও স্থানীয়দের দাবি নিহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এছাড়া দুই বিএসএফ সদস্য—বিমল প্রসাদ ও অক্ষয় কুমারকে জীবিত আটক করা হয়। যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ, যার মধ্যে ছিল এলএমজি, এসএলআর, হ্যান্ড গ্রেনেড, ম্যাগাজিন, ওয়্যারলেস সেটসহ অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহত বিএসএফ সদস্যদের মরদেহ ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখন সিলেটের পাদুয়া এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প ছিল। স্বাধীনতার পর বিএসএফ ওই এলাকা দখল করে নেয় এবং দীর্ঘ দিন তা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ১৯৯৯ সালে বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকে পাদুয়া ক্যাম্প সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝিনাইদহে নির্মাণাধীন ভবনে রং করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শ্রমিকের মৃত্যু

ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ীর যুদ্ধ: ভারতীয় বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ও বাংলাদেশের গৌরব

আপডেট সময় : ০৬:৪৬:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ী সীমান্তে ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (তৎকালীন বিডিআর) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) উপর শোচনীয় বিজয় অর্জন করে। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

জানা যায়, ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে ভারতীয় কমান্ডো, সেনা ও বিএসএফের প্রায় ৪০০ সদস্যের একটি যৌথবাহিনী সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বড়াইবাড়ী এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। ভোরবেলা বোরো ধানক্ষেতে সেচ দিতে যাওয়া কৃষক মিনহাজ উদ্দিন শতাধিক বিএসএফ সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। তিনি কৌশলে তাদের ক্যাম্পের অবস্থান অন্যদিকে দেখিয়ে দ্রুত বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিডিআর) ক্যাম্পে খবর দেন।

খবর পেয়ে বিডিআর সদস্যরা তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং পাশের ইজলামারী ও খেওয়ারচর ক্যাম্পে সতর্কবার্তা পাঠান। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিএসএফ পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে বিডিআর ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। সংঘর্ষের শুরুতেই বিডিআরের ল্যান্স নায়েক ওয়াহিদুজ্জামান শহীদ হন। সকাল ১০টার দিকে জামালপুর ৩৩ রাইফেলসের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জামানের নেতৃত্বে বিডিআরের একটি বড় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে যুদ্ধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। দুই দিনব্যাপী এই যুদ্ধে বাংলাদেশ পক্ষের আরও দুই জোয়ান—সিপাহী আব্দুল কাদের ও সিপাহী মাহফুজুর রহমান শহীদ হন।

অন্যদিকে, এই যুদ্ধে ভারতীয় বিএসএফের ১৬ জন সদস্য নিহত হয় বলে জানা যায়, যদিও স্থানীয়দের দাবি নিহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এছাড়া দুই বিএসএফ সদস্য—বিমল প্রসাদ ও অক্ষয় কুমারকে জীবিত আটক করা হয়। যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ, যার মধ্যে ছিল এলএমজি, এসএলআর, হ্যান্ড গ্রেনেড, ম্যাগাজিন, ওয়্যারলেস সেটসহ অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহত বিএসএফ সদস্যদের মরদেহ ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখন সিলেটের পাদুয়া এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প ছিল। স্বাধীনতার পর বিএসএফ ওই এলাকা দখল করে নেয় এবং দীর্ঘ দিন তা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ১৯৯৯ সালে বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকে পাদুয়া ক্যাম্প সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।