মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
১২:১৪ পূর্বাহ্ন | ২৯শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহঃস্পতিবার, ১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

স্ক্রিনের মায়া ও মানসিক বিষণ্ণতা: অন্যদের জীবন দেখে আমরা কেন নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করি?

  • হালনাগাদ সময় : ১১:৪৯:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে অন্যের বিলাসী জীবন, দামি গাড়ি বা সুন্দর মুহূর্তের ছবি দেখে হঠাৎ এক ধরনের তীব্র বিষণ্ণতা ও হীনম্মন্যতা চেপে বসা এখন খুব সাধারণ এক সামাজিক ব্যাধি। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অন্যের ঝলমলে জীবনের সাথে নিজের অগোছালো বাস্তবতার তুলনা করা থেকে জন্ম নেওয়া এই অনুভূতি কোনো ব্যক্তির নিজস্ব দুর্বলতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। ১৯৫৪ সালে মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঞ্জারের প্রস্তাবিত ‘সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি’ অনুযায়ী, মানুষ সহজাতভাবেই নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের অবস্থান যাচাই করে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই তুলনা যখন নিজের চেয়ে ‘বেশি সফল’ বা সুখী মনে হওয়া কারো সঙ্গে হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘আপওয়ার্ড সোশ্যাল কম্পারিজন’। ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার গবেষণায় দেখা গেছে, এই ঊর্ধ্বমুখী তুলনা মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং মানসিক অস্বস্তি বৃদ্ধি করে।

আমরা কেন পরিচিত বন্ধুর চেয়ে অপরিচিত ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবন দেখে বেশি প্রভাবিত হই, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯৫৬ সালের ‘প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ’ তত্ত্বে। ইনফ্লুয়েন্সাররা এমনভাবে নিজেদের গল্প বলেন যেন তারা আমাদের খুব পরিচিত, ফলে আমাদের মস্তিষ্ক অজান্তেই তাদের জীবনকে নিজের জীবনের মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেয়। কার্লটন ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, হলিউড তারকাদের চেয়েও একজন ইনফ্লুয়েন্সারের জীবন আমাদের বেশি ঈর্ষান্বিত করে; কারণ মনে হয়—’সে তো আমার মতোই ছিল, সে পারলে আমি পারছি না কেন?’ অথচ আমরা ভুলে যাই যে, এগুলো তাদের জীবনের পূর্ণ চিত্র নয়, বরং হাজারটা সাধারণ মুহূর্ত থেকে বেছে নেওয়া একটি পেশাদারভাবে সাজানো ‘কিউরেটেড রিয়ালিটি’ বা ‘হাইলাইট রিল ইফেক্ট’। অ্যালগরিদমের কারণে যখন আমরা বারবার এমন কনটেন্ট দেখি, তখন মস্তিষ্কে একটি মিথ্যা বাস্তবতা তৈরি হয় যা জীবনের সাধারণ সৌন্দর্যকে আড়াল করে ফেলে।

ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এই প্রবণতাকে বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করেছেন। আদিম যুগে টিকে থাকার জন্য নিজের সামাজিক অবস্থান বোঝা জরুরি ছিল, যা আধুনিক যুগে ‘ফোমো’ বা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে এই মনস্তাত্ত্বিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পথও বিজ্ঞানই দেখিয়েছে। ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার গবেষক মেলিসা হান্টের মতে, যারা প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় মাত্র ৩০ মিনিটে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও একাকিত্বের হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। দিনশেষে মনে রাখতে হবে, অন্যের এডিট করা হাইলাইটের সঙ্গে নিজের অগোছালো বাস্তব জীবনের তুলনা করা স্রেফ নিজের প্রতি অন্যায়। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা লাইক বা কমেন্টে নয়, বরং নিজস্ব যাপনের তৃপ্তিতেই নিহিত।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢামেকে ৭ দিনের জন্য বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট স্থগিত

28 October 2026

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতেই হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

স্ক্রিনের মায়া ও মানসিক বিষণ্ণতা: অন্যদের জীবন দেখে আমরা কেন নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করি?

হালনাগাদ সময় : ১১:৪৯:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে অন্যের বিলাসী জীবন, দামি গাড়ি বা সুন্দর মুহূর্তের ছবি দেখে হঠাৎ এক ধরনের তীব্র বিষণ্ণতা ও হীনম্মন্যতা চেপে বসা এখন খুব সাধারণ এক সামাজিক ব্যাধি। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অন্যের ঝলমলে জীবনের সাথে নিজের অগোছালো বাস্তবতার তুলনা করা থেকে জন্ম নেওয়া এই অনুভূতি কোনো ব্যক্তির নিজস্ব দুর্বলতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। ১৯৫৪ সালে মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঞ্জারের প্রস্তাবিত ‘সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি’ অনুযায়ী, মানুষ সহজাতভাবেই নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের অবস্থান যাচাই করে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই তুলনা যখন নিজের চেয়ে ‘বেশি সফল’ বা সুখী মনে হওয়া কারো সঙ্গে হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘আপওয়ার্ড সোশ্যাল কম্পারিজন’। ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার গবেষণায় দেখা গেছে, এই ঊর্ধ্বমুখী তুলনা মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং মানসিক অস্বস্তি বৃদ্ধি করে।

আমরা কেন পরিচিত বন্ধুর চেয়ে অপরিচিত ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবন দেখে বেশি প্রভাবিত হই, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯৫৬ সালের ‘প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ’ তত্ত্বে। ইনফ্লুয়েন্সাররা এমনভাবে নিজেদের গল্প বলেন যেন তারা আমাদের খুব পরিচিত, ফলে আমাদের মস্তিষ্ক অজান্তেই তাদের জীবনকে নিজের জীবনের মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেয়। কার্লটন ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, হলিউড তারকাদের চেয়েও একজন ইনফ্লুয়েন্সারের জীবন আমাদের বেশি ঈর্ষান্বিত করে; কারণ মনে হয়—’সে তো আমার মতোই ছিল, সে পারলে আমি পারছি না কেন?’ অথচ আমরা ভুলে যাই যে, এগুলো তাদের জীবনের পূর্ণ চিত্র নয়, বরং হাজারটা সাধারণ মুহূর্ত থেকে বেছে নেওয়া একটি পেশাদারভাবে সাজানো ‘কিউরেটেড রিয়ালিটি’ বা ‘হাইলাইট রিল ইফেক্ট’। অ্যালগরিদমের কারণে যখন আমরা বারবার এমন কনটেন্ট দেখি, তখন মস্তিষ্কে একটি মিথ্যা বাস্তবতা তৈরি হয় যা জীবনের সাধারণ সৌন্দর্যকে আড়াল করে ফেলে।

ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এই প্রবণতাকে বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করেছেন। আদিম যুগে টিকে থাকার জন্য নিজের সামাজিক অবস্থান বোঝা জরুরি ছিল, যা আধুনিক যুগে ‘ফোমো’ বা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে এই মনস্তাত্ত্বিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পথও বিজ্ঞানই দেখিয়েছে। ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার গবেষক মেলিসা হান্টের মতে, যারা প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় মাত্র ৩০ মিনিটে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও একাকিত্বের হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। দিনশেষে মনে রাখতে হবে, অন্যের এডিট করা হাইলাইটের সঙ্গে নিজের অগোছালো বাস্তব জীবনের তুলনা করা স্রেফ নিজের প্রতি অন্যায়। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা লাইক বা কমেন্টে নয়, বরং নিজস্ব যাপনের তৃপ্তিতেই নিহিত।

Share this news as a Photo Card