বাংলাদেশ বর্তমানে এক মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যা কোনো আদালত বা সংসদে নয়, বরং সাধারণ জ্বালানি পাম্পের লাইনে দৃশ্যমান হচ্ছে। গবেষক ড. মতিউর রহমানের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্ন বাংলাদেশে এসে এক বীভৎস সমাজতাত্ত্বিক রূপ নিয়েছে। এটি কেবল লিটার প্রতি ডিজেলের হিসাব নয়, বরং আমাদের তথাকথিত সামাজিক সংহতির এক নির্মম পরীক্ষা। পাম্পে জ্বালানি চুরিতে বাধা দেওয়ায় বা সরবরাহের অভাবে সৃষ্ট ক্ষোভে নিরীহ কর্মীদের প্রাণহানি ঘটছে। এই অস্থিরতা বুঝতে হলে আমাদের সমাজতত্ত্ববিদ এমিল ডুর্খাইমের (Émile Durkheim) ‘অ্যানোমি’ (Anomie) ধারণার শরণাপন্ন হতে হবে। ডুর্খাইমের মতে, ‘অ্যানোমি’ হলো এমন এক অবস্থা যখন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী আদর্শিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং অলিখিত সামাজিক নিয়মগুলো তাদের নৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে।
ড. রহমান আরও উল্লেখ করেন সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউমানের (Zygmunt Bauman) ‘তরল ভয়’ (Liquid Fear) তত্ত্বের কথা। বাউমানের মতে, আধুনিক জীবনের প্রধান উদ্বেগ হলো এক ধরণের অদৃশ্য ও মুক্ত-ভাসমান আতঙ্ক, যা হাতের কাছে থাকা যেকোনো ঠুনকো বস্তুর সাথে নিজেকে জুড়ে নেয়। ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত এপ্রিলে বাংলাদেশের জ্বালানির দীর্ঘ সারিটি তেমনই একটি পাত্র। মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির ভয় এই পাম্পের লাইনে এসে উগ্র সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। নড়াইলের তানভীর ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার নাহিদ সরদারের মৃত্যু কিংবা ঢাকার পাম্প কর্মীদের ওপর আক্রমণ—এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সংকটকালীন সময়ে মানুষ ‘প্রত্যেকে নিজের জন্য’ বাঁচার এক আদিম ও হিংস্র যুক্তিতে ফিরে যাচ্ছে।
পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হকের তথ্যমতে, আতঙ্কিত চালকরা প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করায় স্টেশনগুলো দ্রুত শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এই ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত কেনাকাটা বাজারে আরও তীব্র ঘাটতি তৈরি করছে, যা সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই আক্রমণকারীরা কোনো পেশাদার অপরাধী নয়, বরং সাধারণ মানুষ যাদের মধ্যে কাজ করা ‘তরল ভয়’ সাময়িকভাবে সামাজিক সংযমের বাঁধ ভেঙে ফেলেছে। কোভিড-১৯ মহামারি বা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেয়েও বর্তমান এই জ্বালানি সংকট মানুষের মানসিক ভাঙনকে তীব্রতর করেছে, কারণ এর কোনো স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তু নেই।
সরকার অবৈধ মজুত উদ্ধারে অভিযান চালালেও, ডুর্খাইমের মতে শুধু রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ বা লাঠি-গুলির মাধ্যমে ভঙ্গুর সমাজে ঐকমত্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নিয়মগুলো তখনই কার্যকর হয় যখন সাধারণ মানুষ ব্যবস্থাটির ওপর আস্থা পায়। বর্তমান সংকট আমাদের সামনে এই রূঢ় সত্যটি তুলে ধরেছে যে, আমাদের সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ আসলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহজলভ্যতা ও সুষ্ঠু বণ্টনের এক পাতলা স্তরের ওপর নির্ভরশীল। এই স্তরটি যখন ধসে পড়ে, তখন সামাজিক মুখোশগুলো খসে পড়ে এবং যা অবশিষ্ট থাকে তা হলো মানুষের আদিম হিংস্র রূপ। পরিশেষে, ড. মতিউর রহমান সতর্ক করেছেন যে, জ্বালানি সংকট হয়তো একসময় কেটে যাবে, কিন্তু এই সংকট আমাদের সমাজের যে উলঙ্গ ও সহিংস রূপটি আয়নায় তুলে ধরেছে, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও নাগরিক চুক্তির চরম ভঙ্গুরতাকে চিরকাল মনে করিয়ে দেবে।
রিপোর্টারের নাম 

























