ঢাকা ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদ: ২০১০-১১’র পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা?

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’ এক বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল, যা নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়। বিএনপি সেই কমিটিকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ আখ্যা দিয়ে বর্জন করেছিল এবং ২০১১ সালে বিলটি পাসের পর খালেদা জিয়া একে ‘গণতন্ত্রের কফিন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যখন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পুনরায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে? বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি ঘোষিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’কে বিএনপি ‘প্রতারণার দলিল’ বলে প্রত্যাখ্যান করে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব দেওয়ায় জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

বর্তমান সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির হাতে থাকায় সংবিধান সংশোধনের চাবিকাঠি তাদের নিয়ন্ত্রণেই। তবে বিরোধী দল জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের দাবি হলো, কেবল রুটিন মাফিক সংশোধনী নয়, বরং গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তারা সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠনের দাবি জানালেও সংসদীয় বিধি অনুযায়ী তা বিএনপির জন্য মেনে নেওয়া কঠিন। অন্যদিকে, জামায়াত নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং ১১ দলীয় জোটের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে কোনো ‘শঠতা’র আশ্রয় নিলে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ২০১০ সালে বিএনপি যেভাবে কমিটিতে নাম না দিয়ে রাজপথে নেমেছিল, ২০২৬ সালেও বিরোধীরা সেই একই পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষক আমীন আল রশীদের মতে, এই মুহূর্তে সংবিধান বা জুলাই সনদের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে তেলের সরবরাহে যে ধস নেমেছে, তার ফলে পাম্পগুলোতে হাহাকার ও নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সংকটকালে সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের টানাপড়েন দেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং রাজপথের সংঘাত এড়িয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান খুঁজে বের করাই এখন তারেক রহমানের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আপাতত দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক তর্কের চেয়ে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় অভিন্ন সুর খুঁজে পাওয়া দেশ ও মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অধ্যাদেশ ও সংস্কার ইস্যুতে সরকারের ইউ-টার্ন

সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদ: ২০১০-১১’র পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা?

আপডেট সময় : ০১:৩৬:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’ এক বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল, যা নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়। বিএনপি সেই কমিটিকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ আখ্যা দিয়ে বর্জন করেছিল এবং ২০১১ সালে বিলটি পাসের পর খালেদা জিয়া একে ‘গণতন্ত্রের কফিন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যখন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পুনরায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে? বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি ঘোষিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’কে বিএনপি ‘প্রতারণার দলিল’ বলে প্রত্যাখ্যান করে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব দেওয়ায় জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

বর্তমান সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির হাতে থাকায় সংবিধান সংশোধনের চাবিকাঠি তাদের নিয়ন্ত্রণেই। তবে বিরোধী দল জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের দাবি হলো, কেবল রুটিন মাফিক সংশোধনী নয়, বরং গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তারা সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠনের দাবি জানালেও সংসদীয় বিধি অনুযায়ী তা বিএনপির জন্য মেনে নেওয়া কঠিন। অন্যদিকে, জামায়াত নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং ১১ দলীয় জোটের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে কোনো ‘শঠতা’র আশ্রয় নিলে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ২০১০ সালে বিএনপি যেভাবে কমিটিতে নাম না দিয়ে রাজপথে নেমেছিল, ২০২৬ সালেও বিরোধীরা সেই একই পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষক আমীন আল রশীদের মতে, এই মুহূর্তে সংবিধান বা জুলাই সনদের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে তেলের সরবরাহে যে ধস নেমেছে, তার ফলে পাম্পগুলোতে হাহাকার ও নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সংকটকালে সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের টানাপড়েন দেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং রাজপথের সংঘাত এড়িয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান খুঁজে বের করাই এখন তারেক রহমানের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আপাতত দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক তর্কের চেয়ে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় অভিন্ন সুর খুঁজে পাওয়া দেশ ও মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর হবে।