ঢাকা ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ কোন পথে: প্রত্যাশা, ইতিহাস ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের পুঞ্জীভূত ‘জঞ্জাল’ সাফ করার এক দুঃসময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৪৭ দিন অতিবাহিত হওয়ায় সরকারের পারফরম্যান্স নিয়ে এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। তবে ৪৮ বছরের পুরনো এবং পাঁচ দফা সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দল হিসেবে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আগের শাসনামলের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে জাতীয় স্বার্থকে সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দেওয়া। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ নিপীড়নের পর নেতা-কর্মীদের মাঝে প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা থাকা স্বাভাবিক হলেও, সফল হতে হলে বিএনপিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের সেই অমোঘ বাণী স্মরণ করা প্রয়োজন যে, কোনো দল যদি জাতীয় স্বার্থে কাজ না করে, তবে তা ভালো দল হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে খুব কম সরকারই এই প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক ট্র্যাজিক বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয় নেতাদের নিয়ে চরম মেরুকরণ। এক দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের নেতাদের ‘মহানায়ক’ বানায় এবং প্রতিপক্ষকে ‘খলনায়ক’ হিসেবে চিত্রিত করে। এই মানসিক বিভাজন দেশের উন্নয়ন ও জাতীয় সংহতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির কুফল আমরা শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা পর্যন্ত দেখেছি। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে তারা জনগণের পালস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত পতনের করুণ পরিণতি বরণ করেছেন। আইউব খান, এরশাদ কিংবা শেখ হাসিনার মতো ‘লৌহমানব’ বা ‘আয়রন লেডি’রা প্রমাণ করেছেন যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। রাজনীতিবিদরা যখন জনগণকে ক্ষমতার উৎস না ভেবে নিজেদেরই ক্ষমতার উৎস মনে করেন, তখনই পতনের সিঁড়ি তৈরি হয়।

জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন, “প্রতারণা যখন সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তখন সত্য কথা বলাই এক ধরনের বিপ্লব।” বাংলাদেশে বারবার জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতারণা ঘটেছে, যার ফলে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে এবং শাসকের দম্ভের প্রতীকগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই চক্র থেকে বের হতে হলে জাতীয় ঐক্য ও চেতনার প্রকৃত প্রয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে যে চির-সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজমান, তার কারণে দেশের প্রকৃত মেধাবীরা রাজনীতিতে আসতে ভয় পান। তারা কেবল দূর থেকে আশা করেন যে, যে দলই ক্ষমতায় আসুক তারা যেন দেশকে লুটপাট করে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’তে পরিণত না করে। বিএনপি সরকারের জন্য এখন এটিই পরীক্ষা যে, তারা কি অতীতের ভুল শুধরে একটি নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দিতে পারবে, নাকি ক্ষমতার মোহ তাদেরও পূর্বসূরিদের মতো অন্ধ করে তুলবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অধ্যাদেশ ও সংস্কার ইস্যুতে সরকারের ইউ-টার্ন

বাংলাদেশ কোন পথে: প্রত্যাশা, ইতিহাস ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ১২:১৩:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের পুঞ্জীভূত ‘জঞ্জাল’ সাফ করার এক দুঃসময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৪৭ দিন অতিবাহিত হওয়ায় সরকারের পারফরম্যান্স নিয়ে এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। তবে ৪৮ বছরের পুরনো এবং পাঁচ দফা সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দল হিসেবে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আগের শাসনামলের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে জাতীয় স্বার্থকে সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দেওয়া। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ নিপীড়নের পর নেতা-কর্মীদের মাঝে প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা থাকা স্বাভাবিক হলেও, সফল হতে হলে বিএনপিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের সেই অমোঘ বাণী স্মরণ করা প্রয়োজন যে, কোনো দল যদি জাতীয় স্বার্থে কাজ না করে, তবে তা ভালো দল হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে খুব কম সরকারই এই প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক ট্র্যাজিক বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয় নেতাদের নিয়ে চরম মেরুকরণ। এক দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের নেতাদের ‘মহানায়ক’ বানায় এবং প্রতিপক্ষকে ‘খলনায়ক’ হিসেবে চিত্রিত করে। এই মানসিক বিভাজন দেশের উন্নয়ন ও জাতীয় সংহতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির কুফল আমরা শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা পর্যন্ত দেখেছি। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে তারা জনগণের পালস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত পতনের করুণ পরিণতি বরণ করেছেন। আইউব খান, এরশাদ কিংবা শেখ হাসিনার মতো ‘লৌহমানব’ বা ‘আয়রন লেডি’রা প্রমাণ করেছেন যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। রাজনীতিবিদরা যখন জনগণকে ক্ষমতার উৎস না ভেবে নিজেদেরই ক্ষমতার উৎস মনে করেন, তখনই পতনের সিঁড়ি তৈরি হয়।

জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন, “প্রতারণা যখন সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তখন সত্য কথা বলাই এক ধরনের বিপ্লব।” বাংলাদেশে বারবার জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতারণা ঘটেছে, যার ফলে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে এবং শাসকের দম্ভের প্রতীকগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই চক্র থেকে বের হতে হলে জাতীয় ঐক্য ও চেতনার প্রকৃত প্রয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে যে চির-সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজমান, তার কারণে দেশের প্রকৃত মেধাবীরা রাজনীতিতে আসতে ভয় পান। তারা কেবল দূর থেকে আশা করেন যে, যে দলই ক্ষমতায় আসুক তারা যেন দেশকে লুটপাট করে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’তে পরিণত না করে। বিএনপি সরকারের জন্য এখন এটিই পরীক্ষা যে, তারা কি অতীতের ভুল শুধরে একটি নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দিতে পারবে, নাকি ক্ষমতার মোহ তাদেরও পূর্বসূরিদের মতো অন্ধ করে তুলবে।