বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কোটি মানুষের জীবিকার প্রধান ভিত্তি মৎস্য খাতের উন্নয়নে ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নদীমাতৃক এই দেশে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ভরাট ও দখলের কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছিল, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল মৎস্য উৎপাদন ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিকে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং একটি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়াটি মূলত একটি ‘হাইড্রোলজিক্যাল রিকানেকশন’ বা জলপ্রবাহ পুনঃসংযোগের প্রক্রিয়া, যেখানে নদী, খাল ও প্লাবনভূমিকে একটি একক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নদী হলো মূল ধমনী, খাল সেই পানিকে গ্রামে ছড়িয়ে দেয় এবং প্লাবনভূমি হলো মাছের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান এই প্রাকৃতিক জলব্যবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করে যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, বর্তমানের এই উদ্যোগটি সেই দর্শনেরই একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ যা ‘Nature-based Solution’ হিসেবে পরিচিত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মৎস্য খাত জাতীয় জিডিপিতে ২.৫% থেকে ৪.৪% অবদান রাখে এবং কৃষি জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। বর্তমানে দেশে বার্ষিক মাছ উৎপাদন প্রায় ৫.০১ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশই আসে অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে। বিশেষ করে প্লাবনভূমি থেকে মোট উৎপাদনের ১৭ শতাংশ মাছ আসে, যা খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে চরম হুমকির মুখে ছিল। খাল কাটা কর্মসূচির মাধ্যমে যদি প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদন মাত্র ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
তবে তা জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। বর্তমানে মাছের মোট উৎপাদনের ৫৫-৫৭ শতাংশ কৃত্রিম চাষ বা অ্যাকুয়াকালচার থেকে আসলেও, প্রাকৃতিক উৎস বা ক্যাপচার ফিশারিজের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এটি অত্যন্ত কম খরচে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ (SIS) সরবরাহ করে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশের জোগান দেয়। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুনরায় সক্রিয় করা সম্ভব যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মৎস্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
খাল কাটা কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের হারানো জলজ জীববৈচিত্র্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একসময় এ দেশে ২৬০টিরও বেশি প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ পাওয়া যেত, যার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। খালগুলো পুনঃখনন করা হলে মাছের মাইগ্রেশন রুট বা চলাচলের পথ পুনরুদ্ধার হবে এবং শিং, মাগুর, কৈ, পাবদার মতো দেশীয় প্রজাতিগুলোর ডিম ছাড়ার প্রাকৃতিক ক্ষেত্র ফিরে আসবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সংযুক্ত প্লাবনভূমিতে মাছের উৎপাদন বিচ্ছিন্ন জলাশয়ের তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি হতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৯১ হাজার মেট্রিক টন মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে যার মূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি; প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়লে এই বৈদেশিক আয় আরও বৃদ্ধি পাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় এই কর্মসূচি একটি কার্যকর অভিযোজন কৌশল হিসেবে কাজ করবে, কারণ খালগুলো অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন এবং খরার সময় পানি সংরক্ষণের প্রাকৃতিক আধার হিসেবে কাজ করে। তবে এই উদ্যোগের স্থায়ী সাফল্যের জন্য অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ দখল রোধ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই কর্মসূচি শুধু মৎস্য খাত নয়, বরং পুরো গ্রামীণ বাংলাদেশের চেহারা বদলে দিয়ে ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নেবে।
রিপোর্টারের নাম 

























