ঢাকা ০৩:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ: আইনি ও কৌশলগত সংকটে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (RTA) এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ‘পাল্টা শুল্ক’ (Countervailing Duties) অবৈধ ঘোষণা করার পর এই চুক্তির নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেছে। যে শুল্কচাপ কমানোর আশায় অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে এই চুক্তিতে সই করেছিল, সেই শুল্কই এখন আইনত অস্তিত্বহীন। ফলে অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই চুক্তিকে ‘অসম’ ও ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের জোরালো দাবি তুলছেন।

শুল্ক সুবিধার অসম সমীকরণ

চুক্তির শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সুবিধা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ঝুঁকে আছে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিতে হবে, যার ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক্কলন অনুযায়ী সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হবে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ১,৬৩৮টি পণ্যে শুল্ক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গত বছর এই তালিকার মাত্র ১৪টি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে, যার মোট মূল্য ছিল মাত্র ৬.৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ, বাংলাদেশের শত কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির বিনিময়ে প্রাপ্ত সুবিধা মাত্র দেড় কোটি টাকার মতো। রপ্তানির বড় খাত যেমন তৈরি পোশাক বা টুপির মতো পণ্যগুলো এই সুবিধার তালিকায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

কৌশলগত ও নীতিনির্ধারণী ঝুঁকি

চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এতে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে:

  • জ্বলানি ও আকাশপথ: আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন এলএনজি কেনা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি।
  • প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি: নির্দিষ্ট দেশ (চীন ও রাশিয়া) থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা সীমিত রাখা এবং মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের বাজার সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা।
  • নীতিগত স্বাধীনতা: ডিজিটাল বাণিজ্য এবং তৃতীয় দেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন মানদণ্ড অনুসরণের শর্ত, যা বাংলাদেশের স্বাধীন নীতিনির্ধারণী ক্ষমতাকে খর্ব করতে পারে বলে মনে করছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

রাজনৈতিক ও বিশেষজ্ঞ মহলের প্রতিক্রিয়া

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই চুক্তিকে ‘দাসত্বের দলিল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, একটি অনির্বাচিত সরকারের শেষ সময়ে এমন দীর্ঘমেয়াদী আত্মঘাতী চুক্তি করা ঠিক হয়নি। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে রাজপথে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে এবং ৩০ দিনের মধ্যে চুক্তি বাতিলের আল্টিমেটাম দিয়েছে। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, এটি ডলারের দাসত্বে পরিণত হওয়ার এক নীল নকশা।

সামনের পথ কী?

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, মার্কিন আদালতের রায়ের পর চুক্তিটি বাতিলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনও আশ্বস্ত করেছেন যে চুক্তিতে ‘এক্সিট’ ক্লজ বা বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন নির্বাচিত সরকারকে এই চুক্তিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে হবে। অন্যথায়, এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সেতুর অভাবে রংপুরের তারাগঞ্জে ২০ গ্রামের হাজারো মানুষের দুর্ভোগ

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ: আইনি ও কৌশলগত সংকটে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১২:৪৩:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (RTA) এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ‘পাল্টা শুল্ক’ (Countervailing Duties) অবৈধ ঘোষণা করার পর এই চুক্তির নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেছে। যে শুল্কচাপ কমানোর আশায় অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে এই চুক্তিতে সই করেছিল, সেই শুল্কই এখন আইনত অস্তিত্বহীন। ফলে অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই চুক্তিকে ‘অসম’ ও ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের জোরালো দাবি তুলছেন।

শুল্ক সুবিধার অসম সমীকরণ

চুক্তির শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সুবিধা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ঝুঁকে আছে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিতে হবে, যার ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক্কলন অনুযায়ী সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হবে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ১,৬৩৮টি পণ্যে শুল্ক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গত বছর এই তালিকার মাত্র ১৪টি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে, যার মোট মূল্য ছিল মাত্র ৬.৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ, বাংলাদেশের শত কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির বিনিময়ে প্রাপ্ত সুবিধা মাত্র দেড় কোটি টাকার মতো। রপ্তানির বড় খাত যেমন তৈরি পোশাক বা টুপির মতো পণ্যগুলো এই সুবিধার তালিকায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

কৌশলগত ও নীতিনির্ধারণী ঝুঁকি

চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এতে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে:

  • জ্বলানি ও আকাশপথ: আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন এলএনজি কেনা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি।
  • প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি: নির্দিষ্ট দেশ (চীন ও রাশিয়া) থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা সীমিত রাখা এবং মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের বাজার সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা।
  • নীতিগত স্বাধীনতা: ডিজিটাল বাণিজ্য এবং তৃতীয় দেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন মানদণ্ড অনুসরণের শর্ত, যা বাংলাদেশের স্বাধীন নীতিনির্ধারণী ক্ষমতাকে খর্ব করতে পারে বলে মনে করছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

রাজনৈতিক ও বিশেষজ্ঞ মহলের প্রতিক্রিয়া

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই চুক্তিকে ‘দাসত্বের দলিল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, একটি অনির্বাচিত সরকারের শেষ সময়ে এমন দীর্ঘমেয়াদী আত্মঘাতী চুক্তি করা ঠিক হয়নি। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে রাজপথে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে এবং ৩০ দিনের মধ্যে চুক্তি বাতিলের আল্টিমেটাম দিয়েছে। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, এটি ডলারের দাসত্বে পরিণত হওয়ার এক নীল নকশা।

সামনের পথ কী?

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, মার্কিন আদালতের রায়ের পর চুক্তিটি বাতিলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনও আশ্বস্ত করেছেন যে চুক্তিতে ‘এক্সিট’ ক্লজ বা বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন নির্বাচিত সরকারকে এই চুক্তিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে হবে। অন্যথায়, এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।