কুমিল্লার গোমতী নদীর বুকে যেন নেমেছিল এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ। সকাল থেকেই নদীর বিভিন্ন ঘাটে জড়ো হন শত শত জেলে ও স্থানীয় মানুষ। হাতে পলো, চোখে উত্তেজনা, দলবেঁধে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী পলো দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন। এই আয়োজন ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ, যেখানে কিশোর থেকে বৃদ্ধ—সবাই অংশগ্রহণ করেন।
গতকাল সোমবার সকাল ১০টা থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে দলে দলে মাছ শিকারিরা যোগ দিতে থাকেন এই পলো উৎসবে। চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, সদর দক্ষিণ ও সদর উপজেলা থেকে তিন শতাধিক নবীন-প্রবীণ মিলিত হন। বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত দলবেঁধে মাছ ধরেন তারা।
এই জমজমাট আয়োজনে সবচেয়ে বড় চমক দেখান ৮৫ বছর বয়সি প্রবীণ জেলে আবু হানিফ। তিনি ছিলেন মাছ ধরা দলের প্রধান। প্রায় ৫৫ বছর ধরে মাছ ধরেন তিনি। বয়সের ভারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি পলো দিয়ে ধরেন প্রায় ১০ কেজি ওজনের একটি বিরল হলুদ কার্ফ মাছ। আবু হানিফ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি পলো দিয়ে মাছ ধরে থাকেন। প্রায় ৫৫-৬০ বছর ধরে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা তার। তিনি অসংখ্যবার বড় বড় আকারের মাছ ধরেছেন। নদী থেকে সর্বোচ্চ ৩০ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ ধরার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
ওমান প্রবাসী চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সোহাগ রানা ছুটিতে এসে শামিল হয়েছিলেন মাছ শিকারের জন্য। নদীতে নামার ১০ মিনিটের মধ্যে পলো দিয়ে শিকার করেন ৫ কেজি ওজনের কার্ফ মাছ। তিনি জানান, এত আনন্দ বলে প্রকাশ করা যাবে না। চৌদ্দগ্রাম থেকে তারা ১০ জন এসেছেন মাছ ধরার জন্য। এছাড়া লালমাই বাগমারা থেকে পলো দিয়ে মাছ ধরতে এসেছেন আতিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ৮ কেজি ওজনের একটি পাঙ্গাশ মাছ পেয়েছেন। নদীর মাছের মজাই আলাদা। প্রতি বছর চৈত্র মাসে তারা নদীতে মাছ ধরতে আসেন।
বছরের বিভিন্ন সময়েই দেখা যায় তাদের এমন মাছ ধরার আয়োজন। বিভিন্ন উপজেলায় দলের প্রতিনিধি থাকেন। সর্দার সব প্রতিনিধিকে নির্দিষ্ট স্থান ও সময় জানিয়ে দিলেই সবাই উপস্থিত হয়ে যান নির্দিষ্ট ঠিকানায়। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে চলছে পলো দিয়ে এমন মাছ ধরা। পলো দিয়ে মাছ ধরার এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীর পানিতে একসঙ্গে নেমে দলবেঁধে মাছ ধরার দৃশ্য যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐক্য ও আনন্দের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
রিপোর্টারের নাম 
























