ঢাকা ০৩:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

যুদ্ধের বিভীষিকা পেরিয়ে মানবতার আলো: সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অকথিত উপাখ্যান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কেবল রণাঙ্গনের বীরত্বগাথাই নয়, এটি মানবতার অদম্য স্পৃহা, গভীর দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের এক মহাকাব্যও বটে। এই মহাকাব্যের এক বিরল এবং তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অধ্যায় রচনা করেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, শিক্ষার্থী এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালির ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে উঠেছিল আহত ও অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, ওষুধের তীব্র সংকট এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সেবা দিয়ে গেছেন। এই মানবিক সংগ্রামের অগ্রভাগে ছিলেন সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমদ, যিনি ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, নেতা এবং মানবতার মূর্ত প্রতীক। মার্চ মাসের শুরুতেই তিনি সম্ভাব্য সংঘাতের পূর্বাভাস পেয়ে হাসপাতালে একটি জরুরি ব্লাড ব্যাংক এবং ইমার্জেন্সি স্কোয়াড গঠন করেন, যা পরবর্তীতে অসংখ্য আহত মানুষের জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়েছিল।

২৫শে মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার পর যখন সিলেটেও রক্তপাত শুরু হয়, তখন ডা. শামসুদ্দীন দিনরাত হাসপাতালে থেকে আহতদের চিকিৎসা দিতে থাকেন। তিনি তার ছাত্রদের বলেছিলেন যে এই বর্বরতার একমাত্র সমাধান হলো স্বাধীনতা। তার এই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শুধু চিকিৎসাসেবা দিয়েই তিনি থেমে থাকেননি, মানবতার এক বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহত পাকিস্তানি সৈন্যদেরও তিনি চিকিৎসা দেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের তাদের ওপর কোনো প্রকার আক্রমণ না করার জন্য অনুরোধ করেন। চিকিৎসকের নৈতিকতার প্রতি তার এই অবিচল আনুগত্য তাকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছিল।

যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন সিলেট শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং মানুষ গ্রামে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু হাসপাতাল তখনো গুলিবিদ্ধ মানুষের আর্তনাদে পূর্ণ ছিল। অধিকাংশ চিকিৎসক নিরাপত্তার কারণে শহর ছেড়ে চলে গেলেও ডা. শামসুদ্দীন হাসপাতাল ত্যাগ করেননি। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, ‘আমার রোগীদের ফেলে আমি কোথাও যাব না।’ তার এই মহৎ উদ্যোগে পাশে ছিলেন কয়েকজন সাহসী সহকর্মী, যেমন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ডা. শ্যামল কান্তি লালা, অ্যাম্বুলেন্স চালক কোরবান আলী, নার্স মাহমুদুর রহমান এবং আরও কয়েকজন। তারা জানতেন মৃত্যুর ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, তবুও মানবতার সেবায় তারা অবিচল ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৯ই এপ্রিল সকাল। সিলেট মেডিকেল কলেজের আশেপাশে তখন তীব্র যুদ্ধ চলছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি কনভয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল…

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে মতপার্থক্য

যুদ্ধের বিভীষিকা পেরিয়ে মানবতার আলো: সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অকথিত উপাখ্যান

আপডেট সময় : ১১:৩৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কেবল রণাঙ্গনের বীরত্বগাথাই নয়, এটি মানবতার অদম্য স্পৃহা, গভীর দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের এক মহাকাব্যও বটে। এই মহাকাব্যের এক বিরল এবং তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অধ্যায় রচনা করেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, শিক্ষার্থী এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালির ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে উঠেছিল আহত ও অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, ওষুধের তীব্র সংকট এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সেবা দিয়ে গেছেন। এই মানবিক সংগ্রামের অগ্রভাগে ছিলেন সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমদ, যিনি ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, নেতা এবং মানবতার মূর্ত প্রতীক। মার্চ মাসের শুরুতেই তিনি সম্ভাব্য সংঘাতের পূর্বাভাস পেয়ে হাসপাতালে একটি জরুরি ব্লাড ব্যাংক এবং ইমার্জেন্সি স্কোয়াড গঠন করেন, যা পরবর্তীতে অসংখ্য আহত মানুষের জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়েছিল।

২৫শে মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার পর যখন সিলেটেও রক্তপাত শুরু হয়, তখন ডা. শামসুদ্দীন দিনরাত হাসপাতালে থেকে আহতদের চিকিৎসা দিতে থাকেন। তিনি তার ছাত্রদের বলেছিলেন যে এই বর্বরতার একমাত্র সমাধান হলো স্বাধীনতা। তার এই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শুধু চিকিৎসাসেবা দিয়েই তিনি থেমে থাকেননি, মানবতার এক বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহত পাকিস্তানি সৈন্যদেরও তিনি চিকিৎসা দেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের তাদের ওপর কোনো প্রকার আক্রমণ না করার জন্য অনুরোধ করেন। চিকিৎসকের নৈতিকতার প্রতি তার এই অবিচল আনুগত্য তাকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছিল।

যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন সিলেট শহর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং মানুষ গ্রামে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু হাসপাতাল তখনো গুলিবিদ্ধ মানুষের আর্তনাদে পূর্ণ ছিল। অধিকাংশ চিকিৎসক নিরাপত্তার কারণে শহর ছেড়ে চলে গেলেও ডা. শামসুদ্দীন হাসপাতাল ত্যাগ করেননি। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, ‘আমার রোগীদের ফেলে আমি কোথাও যাব না।’ তার এই মহৎ উদ্যোগে পাশে ছিলেন কয়েকজন সাহসী সহকর্মী, যেমন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ডা. শ্যামল কান্তি লালা, অ্যাম্বুলেন্স চালক কোরবান আলী, নার্স মাহমুদুর রহমান এবং আরও কয়েকজন। তারা জানতেন মৃত্যুর ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, তবুও মানবতার সেবায় তারা অবিচল ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৯ই এপ্রিল সকাল। সিলেট মেডিকেল কলেজের আশেপাশে তখন তীব্র যুদ্ধ চলছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি কনভয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল…