উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও বাংলাদেশ আপাতত সেই পথে হাঁটতে কিছুটা বিরতি চাইছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সব মানদণ্ড পূরণ হওয়া সত্ত্বেও, নির্ধারিত ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই সময়সীমা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী আগামী ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের তালিকা থেকে বাংলাদেশের এলডিসি মর্যাদা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই প্রক্রিয়া আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই সময় বৃদ্ধির প্রধান যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে যে, উত্তরণের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময়টি মূলত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলাতেই ব্যয় হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও খাদ্য সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে পড়েছে।
এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটের বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ার ফলে নীতিনির্ধারণী মনোযোগ উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে সরে গিয়ে সাময়িক স্থিতিশীলতা রক্ষার দিকে চলে গেছে।
এলডিসি মর্যাদা হারালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ যেসব বিশেষ সুবিধা পায়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা (জিএসপি) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারানোর আশঙ্কাও এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, হঠাৎ করে এই সুবিধাগুলো চলে গেলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই অতিরিক্ত তিন বছর সময় পেলে কাঠামোগত সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন করে প্রস্তুতি আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, যেহেতু বাংলাদেশ এখনও তিনটি সূচকেই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তাই কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ দেখিয়ে সময় বৃদ্ধি করা সহজ নাও হতে পারে। সব মিলিয়ে, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদার গৌরব এবং বাণিজ্যিক বাস্তবতার ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রিপোর্টারের নাম 

























