ঢাকা ০৫:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ত্রয়োদশ নির্বাচন: হাইকোর্টে অর্ধশত আসনের ফল চ্যালেঞ্জ, দীর্ঘসূত্রতার শঙ্কায় বিচার প্রক্রিয়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচনী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন প্রায় অর্ধশত পরাজিত প্রার্থী। গত কয়েক দিনে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়। মামলার বাদীদের তালিকায় রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ এবং বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম এ কাইয়ুম ও হাবিবুর রহমান হাবিবের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা।

বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব মামলা শুনানির জন্য গ্রহণ (অ্যাডমিট) করে বিবাদীদের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে বিতর্কিত আসনগুলোর ব্যবহৃত ব্যালট পেপার, রেজাল্ট শিট ও অন্যান্য নির্বাচনী নথি সীলগালা করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিজস্ব হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে ভোট পুনর্গণনা করা যায়।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতা: আইন বিশেষজ্ঞরা এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী এই মামলাগুলো ‘ইলেকশন পিটিশন’ হিসেবে পরিচিত, যা মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের মতে, এসব মামলার অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তিনি জানান, বিচারিক প্রক্রিয়া এত ধীরগতিতে চলে যে অনেক সময় সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও মামলা নিষ্পত্তি হয় না। ফলে বাদীরা অনেক সময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং সাক্ষীদের পাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়ে।

আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, একটি সাধারণ দেওয়ানি মামলার মতোই এখানে আরজি দাখিল, নোটিশ জারি, ইস্যু গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক—এই দীর্ঘ ধাপগুলো পার হতে হয়। তিনি পরামর্শ দেন, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একাধিক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রতিদিন শুনানি করা প্রয়োজন। অন্যথায়, ৫ শতাধিক পিটিশন সুরাহা করা একটি মাত্র বেঞ্চের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

হাইকোর্টে যারা ফল চ্যালেঞ্জ করেছেন: নথি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অর্ধশত প্রার্থী মামলা করেছেন, যার মধ্যে বিএনপির ২৬ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২০ জন এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা রয়েছেন।

  • বিএনপি: ঢাকা-১১ আসনে এম এ কাইয়ুম, পাবনা-৪ আসনে হাবিবুর রহমান হাবিব, ময়মনসিংহ-১ আসনে সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স এবং রাজশাহী-১ আসনে মে. জে. (অব.) মো. শরীফউদ্দিনসহ ২৬ জন।
  • জামায়াত: খুলনা-৫ আসনে মিয়া গোলাম পরওয়ার, কক্সবাজার-২ আসনে হামিদুর রহমান আজাদ এবং পিরোজপুর-২ আসনে শামীম সাঈদীসহ ২০ জন।
  • অন্যান্য: ঢাকা-১৩ আসনে মাওলানা মামুনুল হক এবং চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপি নেতা অলি আহম্মেদের ছেলে ওমর ফারুক মামলা করেছেন।

আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্ট যদি কোনো প্রার্থীর পক্ষে রায় দেন, তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এই দ্বি-স্তর বিশিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত রায় আসতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। তবে আবেদনকারীরা যদি শুরু থেকেই সক্রিয় থাকেন এবং আদালত বিশেষ অগ্রাধিকার দেন, তবেই দ্রুত ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইরানকে দমানোর সক্ষমতা নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র’

ত্রয়োদশ নির্বাচন: হাইকোর্টে অর্ধশত আসনের ফল চ্যালেঞ্জ, দীর্ঘসূত্রতার শঙ্কায় বিচার প্রক্রিয়া

আপডেট সময় : ০২:০৭:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচনী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন প্রায় অর্ধশত পরাজিত প্রার্থী। গত কয়েক দিনে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়। মামলার বাদীদের তালিকায় রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ এবং বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম এ কাইয়ুম ও হাবিবুর রহমান হাবিবের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা।

বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব মামলা শুনানির জন্য গ্রহণ (অ্যাডমিট) করে বিবাদীদের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে বিতর্কিত আসনগুলোর ব্যবহৃত ব্যালট পেপার, রেজাল্ট শিট ও অন্যান্য নির্বাচনী নথি সীলগালা করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিজস্ব হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে ভোট পুনর্গণনা করা যায়।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতা: আইন বিশেষজ্ঞরা এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী এই মামলাগুলো ‘ইলেকশন পিটিশন’ হিসেবে পরিচিত, যা মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের মতে, এসব মামলার অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তিনি জানান, বিচারিক প্রক্রিয়া এত ধীরগতিতে চলে যে অনেক সময় সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও মামলা নিষ্পত্তি হয় না। ফলে বাদীরা অনেক সময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং সাক্ষীদের পাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়ে।

আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, একটি সাধারণ দেওয়ানি মামলার মতোই এখানে আরজি দাখিল, নোটিশ জারি, ইস্যু গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক—এই দীর্ঘ ধাপগুলো পার হতে হয়। তিনি পরামর্শ দেন, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একাধিক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রতিদিন শুনানি করা প্রয়োজন। অন্যথায়, ৫ শতাধিক পিটিশন সুরাহা করা একটি মাত্র বেঞ্চের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

হাইকোর্টে যারা ফল চ্যালেঞ্জ করেছেন: নথি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অর্ধশত প্রার্থী মামলা করেছেন, যার মধ্যে বিএনপির ২৬ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২০ জন এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা রয়েছেন।

  • বিএনপি: ঢাকা-১১ আসনে এম এ কাইয়ুম, পাবনা-৪ আসনে হাবিবুর রহমান হাবিব, ময়মনসিংহ-১ আসনে সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স এবং রাজশাহী-১ আসনে মে. জে. (অব.) মো. শরীফউদ্দিনসহ ২৬ জন।
  • জামায়াত: খুলনা-৫ আসনে মিয়া গোলাম পরওয়ার, কক্সবাজার-২ আসনে হামিদুর রহমান আজাদ এবং পিরোজপুর-২ আসনে শামীম সাঈদীসহ ২০ জন।
  • অন্যান্য: ঢাকা-১৩ আসনে মাওলানা মামুনুল হক এবং চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপি নেতা অলি আহম্মেদের ছেলে ওমর ফারুক মামলা করেছেন।

আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্ট যদি কোনো প্রার্থীর পক্ষে রায় দেন, তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এই দ্বি-স্তর বিশিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত রায় আসতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। তবে আবেদনকারীরা যদি শুরু থেকেই সক্রিয় থাকেন এবং আদালত বিশেষ অগ্রাধিকার দেন, তবেই দ্রুত ফলাফল পাওয়া সম্ভব।