জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদি আত্মদানের ওপর দাঁড়িয়ে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হয়েছিল, সেখানে এক চাঞ্চল্যকর ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ বিচারিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, সেই প্রসিকিউশন টিমের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে ‘কোটি টাকার ঘুষ’ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। একজন হেভিওয়েট আসামিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থের দরকষাকষি এবং সেই সংশ্লিষ্ট ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনায় স্তম্ভিত পুরো দেশ।
ঘটনার নেপথ্যে ও ফাঁস হওয়া ফোনালাপ: গত ৯ মার্চ প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। তবে পদত্যাগের পরপরই তাঁর দুটি ফোনালাপ গণমাধ্যমে ফাঁস হয়। অডিওতে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিনের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করতে শোনা যায় তাঁকে। ফোনের অপর প্রান্তে ছিলেন ওই আওয়ামী লীগ নেতার আইনজীবী ও প্রাক্তন স্ত্রী রিজওয়ানা ইউসূফ। কথোপকথনের একপর্যায়ে সাইমুম রেজাকে বলতে শোনা যায়, “সব মিলিয়ে ওনার ব্যাপারে আমার একটা এক্সপেক্টেশন থাকবে যে ‘এক’ (এক কোটি)।” এমনকি এই অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাবও দেন তিনি।
মামলার প্রেক্ষাপট ও রহস্যজনক রদবদল: ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলায় ফজলে করিম চৌধুরীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য রয়েছে আগামী ১৬ মার্চ। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার দায়িত্ব বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। শুরুতে সাইমুম রেজা দায়িত্বে থাকলেও পরে তাঁকে সরিয়ে মঈনুল করিমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে মাত্র দুই মাসের মাথায় মামলাটির দায়িত্ব পুনরায় সাইমুম রেজার কাছে ফিরিয়ে আনা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই তিনি আসামিপক্ষের সাথে অর্থের দরকষাকষি শুরু করেন।
অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থন: অভিযোগ অস্বীকার করে সাইমুম রেজা তালুকদার দাবি করেছেন, এটি একটি ষড়যন্ত্র। তিনি জানান, চিফ প্রসিকিউটর কাকে কোন মামলায় রাখবেন তা একান্তই প্রশাসনিক বিষয়। ফোনালাপের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যারা অভিযোগ করছেন, তারাই প্রমাণ করুক। কোনো অর্থ লেনদেন নিয়ে আলাপ হয়নি।” তিনি নিজেকে ‘সৎ’ দাবি করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, তিনি ট্রাইব্যুনালে দিনের পর দিন একই শার্ট পরে ঘুরেছেন।
কণ্ঠস্বর পরীক্ষা ও তদন্ত কমিটির তৎপরতা: ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক কারিগরি পরীক্ষার পর জানিয়েছেন যে, অডিওর কণ্ঠস্বরটি সাইমুম রেজার বলেই মনে হয়েছে। এদিকে, বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এই ঘটনা খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “দুর্নীতির ন্যূনতম প্রমাণ পাওয়া গেলে তা বরদাশত করা হবে না। এটি আমাদের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে।”
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এই ঘটনাকে বিচার ব্যবস্থার জন্য ‘মর্মান্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে কেবল প্রশাসনিক তদন্ত যথেষ্ট নয়। বরং একটি নিরপেক্ষ ও বহুপাক্ষিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়।
রিপোর্টারের নাম 

























