রাজধানীর প্রগতি সরণি থেকে শুরু করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর কিংবা যাত্রাবাড়ী—ঢাকার প্রতিটি প্রধান সড়ক ও অলিগলি এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে। এক সময় যা ছিল কেবল অলিগলির বাহন, তা এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মূল সড়কে, এমনকি উড়াল হাসপাতালেও। যান্ত্রিক যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে এই রিকশাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সাধারণ মানুষের কাছে এই বাহনটি এখন ঢাকার ‘বিষফোড়া’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
দুর্ঘটনার মিছিল ও নিরাপত্তাহীনতা
সম্প্রতি বাড্ডার প্রগতি সরণিতে বাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে একটি রিকশা দুমড়ে-মুচড়ে যায়, যেখানে দুই নারী যাত্রী গুরুতর আহত হন। এমন ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তিন চাকার অবৈধ যানের দুর্ঘটনায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফসানা করিম রাচির মতো অসংখ্য তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে এই অনিয়ন্ত্রিত বাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে।
কেন বাড়ছে এই ‘অবৈধ’ বাহন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাতের কোনো অভিভাবক নেই। বিআরটিএ-র হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫০-৬০ লাখ তিন চাকার অবৈধ যান চলছে, যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই আছে ২০ লাখ।
- সহজ বিনিয়োগ: একটি সিএনজি অটোরিকশার দামে প্রায় ৩০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা কেনা সম্ভব।
- শারীরিক পরিশ্রম কম: প্যাডেল রিকশার তুলনায় এতে কষ্ট কম এবং আয় বেশি (মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা)।
- লাইসেন্সহীনতা: চালকের কোনো প্রশিক্ষণ বা যানের কোনো নিবন্ধনের প্রয়োজন হয় না, যা অপরাধীদের জন্য একটি নিরাপদ ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করছে।
যানজট ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “অটোরিকশার বৃদ্ধি এখন জ্যামিতিক হারে হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে দ্রুতগামী যান্ত্রিক যানের সঙ্গে এমন অনিরাপদ বাহন চলতে দেওয়া হয় না।” গবেষণায় দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ মানুষ মনে করেন এই রিকশাই ঢাকার বর্তমান যানজট মহামারির প্রধান কারণ। এটি কেবল মানুষের কর্মঘণ্টাই নষ্ট করছে না, বরং ফুটপাত দখল করে পথচারীদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
সদ্য ক্ষমতা গ্রহণকারী নির্বাচিত সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই বিশৃঙ্খলা দমন করা। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা চলাচল গ্রহণযোগ্য নয়। সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিলে একটি দ্রুত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, ঈদের পর এই যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যাবে।
তবে চালক ও শ্রমিক সংগঠনের দাবি, এর সঙ্গে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি বিজ্ঞানসম্মত নীতিমালার আওতায় এনে নির্দিষ্ট রুটে এসব যান চালানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
রিপোর্টারের নাম 





















