মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানকে গোপন ও সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া। চলমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতে এই প্রথম ওয়াশিংটনের কোনো পারমাণবিক শক্তিধর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর পরোক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর খবর জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সম্পদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান তেহরানকে সরবরাহ করছে। একজন কর্মকর্তা এই সহায়তার ধরণকে ‘যথেষ্ট ব্যাপক এবং পূর্ণাঙ্গ’ বলে অভিহিত করেছেন, যা ইরানের হামলাকে আরও কার্যকর করে তুলছে।
যদিও ওয়াশিংটনে অবস্থিত রুশ দূতাবাস এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে মস্কো এই সংঘাতকে ‘বিনা উসকানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তবে তাদের এই প্রকাশ্যে শান্তির আহ্বানের সঙ্গে গোপন গোয়েন্দা সহায়তার বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার এই সহায়তার ফলেই ইরানের হামলাগুলোতে ‘কৌশলগত উৎকর্ষ’ লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী, ইরানের নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়লেও, গত রবিবার কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। এছাড়া সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনেও নিখুঁত আঘাত হেনেছে ইরান।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ দারা মাসিকোট বলেন, “ইরান বর্তমানে খুব সুনির্দিষ্টভাবে মার্কিন রাডার এবং কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থায় আঘাত হানছে।” তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের নিজস্ব উন্নত সামরিক উপগ্রহ না থাকায় রাশিয়ার অত্যাধুনিক মহাকাশ গবেষণা ও উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য তেহরানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাশিয়া এখন অনেক নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে পারদর্শী। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গবেষক নিকোল গ্রাজুয়েস্কি বলেন, “গত বছরের যুদ্ধের তুলনায় এবারের ইরানি হামলায় অনেক বেশি ‘কৌশলগত উৎকর্ষ’ দেখা যাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে কিয়েভকে দেওয়া মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তা ও কোটি কোটি ডলারের অস্ত্রের জবাব দিতেই রাশিয়া এখন ইরানকে বেছে নিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান রাশিয়াকে সস্তা ড্রোন দিয়ে সহায়তা করেছে, যা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে দিয়েছিল। একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, “রুশরা খুব ভালো করেই জানে আমরা ইউক্রেনীয়দের কী ধরনের সাহায্য দিচ্ছি। তারা এখন তার ‘প্রতিশোধ’ নিতে পেরে খুব খুশি বলেই মনে হচ্ছে।”
গোয়েন্দা তথ্য দিলেও রাশিয়া এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি। মাসিকোটের মতে, ক্রেমলিনের কাছে এখনও ইউক্রেন যুদ্ধই এক নম্বর অগ্রাধিকার। তারা মনে করছে, এই যুদ্ধ তাদের নয়। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়লে রাশিয়ার লাভ, পাশাপাশি এতে ইউক্রেন থেকে পশ্চিমাদের মনোযোগও সরে যাবে।
এদিকে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যানা কেলি রাশিয়ার সহায়তার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও দাবি করেছেন, ইরানি শাসনব্যবস্থা বর্তমানে পুরোপুরি কোণঠাসা। তিনি বলেন, “তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষমতা দিন দিন কমছে, নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোও দাঁড়াতে পারছে না।” তবে মাঠের বাস্তবতা হোয়াইট হাউজের এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রিপোর্টারের নাম 



















