ঢাকা ০৩:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

ভারত মহাসাগরে মানবিকতার জয়: ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে শ্রীলঙ্কার সাহসী পদক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কালো মেঘ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে এক অসাধারণ মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। সাগরে বিপদগ্রস্ত দুই শতাধিক ইরানি নাবিককে উদ্ধার ও আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে কলম্বো। বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা শ্রীলঙ্কার এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত সাহসী ও নীতিবান’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার, যখন শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় ডুবে যায় ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিনের আঘাতে কোনো রণতরি ডুবে যাওয়ার এমন ঘটনা বিরল। এ হামলার পরপরই শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নামে। তারা ৩২ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় এবং ৮৭ জনের মরদেহও উদ্ধার করে। গল উপকূল থেকে ১৯ নটিক্যাল মাইল দূরে পরিচালিত এই সাহসী অভিযানের ভিডিও ও ছবি এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ইরানি জাহাজ, ‘আইআরআইএস বুশেহর’, ইঞ্জিন বিকল হয়ে শ্রীলঙ্কার জলসীমার কাছে আটকা পড়ে। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ‘মিলান ২০২৬’ বহুজাতিক নৌ-মহড়ায় অংশ নেওয়া এই লজিস্টিক জাহাজটির ক্যাপ্টেন ও ইরান সরকারের অনুরোধে শ্রীলঙ্কা এটিকে নিজেদের বন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেয়, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের প্রতি তাদের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকে সাংবাদিকদের জানান, এটি কোনো সাধারণ পরিস্থিতি নয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশন অনুযায়ী, বিপদগ্রস্ত জাহাজের অনুরোধে তারা মানবিক কারণে এই অনুমতি দিয়েছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যুদ্ধে কোনো সাধারণ মানুষের মৃত্যু কাম্য নয়। আমাদের নীতি হলো, প্রতিটি জীবনই আমাদের নিজেদের জীবনের মতো মূল্যবান।’ তার এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর মুখপাত্র বুদ্ধিকা সাম্পাত নিশ্চিত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনেই ভারত মহাসাগরে তাদের নির্ধারিত তল্লাশি ও উদ্ধার এলাকা থেকে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, উদ্ধারকৃত নাবিকদের প্রাথমিকভাবে কলম্বো বন্দরে আনা হচ্ছে। পরে জাহাজটিকে একটি পূর্ব দিকের বন্দরে সরিয়ে নেওয়া হবে। চিকিৎসা ও অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নাবিকদের কলম্বোর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ওয়েলিসারা নৌঘাঁটিতে রাখা হবে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কার্ল ঝা শ্রীলঙ্কার এই পদক্ষেপকে ‘ভারত মহাসাগরের প্রকৃত অভিভাবকের’ ভূমিকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মার্কিন সাংবাদিক রায়ান গ্রিম এবং স্থানীয় সাংবাদিক রাঙ্গা সিরিলালও কলম্বোর নিরপেক্ষ ও মানবিক অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনরা বলছেন, রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে শ্রীলঙ্কা যেভাবে বিমান ও জাহাজ মোতায়েন করে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা-ই প্রকৃত মানবতা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, চরম মেরুকরণের এই বিশ্ব পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার এমন দৃঢ় ও মানবিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। যুদ্ধ বা রাজনীতি যা-ই হোক না কেন, সাগরে বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবন রক্ষা করাই সমুদ্রসীমার চিরন্তন ও প্রধান নীতি হওয়া উচিত—এই সত্যটিই যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল শ্রীলঙ্কা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালী বন্ধের পরিকল্পনা নেই ইরানের, তবে ইসরায়েলি ও মার্কিন জাহাজের জন্য কড়া হুঁশিয়ারি

ভারত মহাসাগরে মানবিকতার জয়: ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে শ্রীলঙ্কার সাহসী পদক্ষেপ

আপডেট সময় : ০৭:২৬:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কালো মেঘ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে এক অসাধারণ মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। সাগরে বিপদগ্রস্ত দুই শতাধিক ইরানি নাবিককে উদ্ধার ও আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে কলম্বো। বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা শ্রীলঙ্কার এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত সাহসী ও নীতিবান’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার, যখন শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় ডুবে যায় ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিনের আঘাতে কোনো রণতরি ডুবে যাওয়ার এমন ঘটনা বিরল। এ হামলার পরপরই শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নামে। তারা ৩২ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় এবং ৮৭ জনের মরদেহও উদ্ধার করে। গল উপকূল থেকে ১৯ নটিক্যাল মাইল দূরে পরিচালিত এই সাহসী অভিযানের ভিডিও ও ছবি এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ইরানি জাহাজ, ‘আইআরআইএস বুশেহর’, ইঞ্জিন বিকল হয়ে শ্রীলঙ্কার জলসীমার কাছে আটকা পড়ে। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ‘মিলান ২০২৬’ বহুজাতিক নৌ-মহড়ায় অংশ নেওয়া এই লজিস্টিক জাহাজটির ক্যাপ্টেন ও ইরান সরকারের অনুরোধে শ্রীলঙ্কা এটিকে নিজেদের বন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেয়, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের প্রতি তাদের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকে সাংবাদিকদের জানান, এটি কোনো সাধারণ পরিস্থিতি নয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশন অনুযায়ী, বিপদগ্রস্ত জাহাজের অনুরোধে তারা মানবিক কারণে এই অনুমতি দিয়েছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যুদ্ধে কোনো সাধারণ মানুষের মৃত্যু কাম্য নয়। আমাদের নীতি হলো, প্রতিটি জীবনই আমাদের নিজেদের জীবনের মতো মূল্যবান।’ তার এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর মুখপাত্র বুদ্ধিকা সাম্পাত নিশ্চিত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনেই ভারত মহাসাগরে তাদের নির্ধারিত তল্লাশি ও উদ্ধার এলাকা থেকে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, উদ্ধারকৃত নাবিকদের প্রাথমিকভাবে কলম্বো বন্দরে আনা হচ্ছে। পরে জাহাজটিকে একটি পূর্ব দিকের বন্দরে সরিয়ে নেওয়া হবে। চিকিৎসা ও অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নাবিকদের কলম্বোর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ওয়েলিসারা নৌঘাঁটিতে রাখা হবে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কার্ল ঝা শ্রীলঙ্কার এই পদক্ষেপকে ‘ভারত মহাসাগরের প্রকৃত অভিভাবকের’ ভূমিকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মার্কিন সাংবাদিক রায়ান গ্রিম এবং স্থানীয় সাংবাদিক রাঙ্গা সিরিলালও কলম্বোর নিরপেক্ষ ও মানবিক অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনরা বলছেন, রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে শ্রীলঙ্কা যেভাবে বিমান ও জাহাজ মোতায়েন করে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা-ই প্রকৃত মানবতা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, চরম মেরুকরণের এই বিশ্ব পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার এমন দৃঢ় ও মানবিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। যুদ্ধ বা রাজনীতি যা-ই হোক না কেন, সাগরে বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবন রক্ষা করাই সমুদ্রসীমার চিরন্তন ও প্রধান নীতি হওয়া উচিত—এই সত্যটিই যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল শ্রীলঙ্কা।