পারস্য উপসাগরে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমায় ইরানের লাগাতার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে তেহরানকে কঠোর অর্থনৈতিক শিক্ষা দেওয়ার কথা ভাবছে আবুধাবি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, আমিরাত তার দেশে গচ্ছিত ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের পরিকল্পনা করছে। এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে ইরানের অর্থনীতির জন্য তা হবে এক মারাত্মক আঘাত, কারণ দীর্ঘকাল ধরে আমিরাতকে ইরান তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। আমিরাত কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, বরং কয়েক দশক ধরে এটি ইরানি ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিবর্গের জন্য পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। ইরানের তেল বিক্রির অর্থ সংগ্রহ এবং সেই অর্থে আঞ্চলিক প্রক্সি ও অস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনার একটি বড় অংশ আমিরাতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য ইরান আমিরাতকেই সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। তাই আমিরাতের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমিরাত মূলত ইরানের গোপন অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানতে চায়। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্যমতে, ইরান আইআরজিসি-র তহবিলের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচুর তেল বিক্রি করে, যার একটি বড় অংশ আমিরাতভিত্তিক কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন হয়।
আবুধাবি শুধু সম্পদ জব্দ নয়, বরং ইরান সংশ্লিষ্ট অবৈধ কোম্পানিগুলো বন্ধ এবং প্রথাগত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অর্থ লেনদেনকারী এক্সচেঞ্জগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে। এছাড়া সমুদ্রসীমায় ইরানের গোপন তেলবাহী ট্যাংকারগুলো জব্দ করার পরিকল্পনাও নীতি নির্ধারকদের টেবিলে রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে পারস্য উপসাগরের অপর পাড়ের প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং পশ্চিমা মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জোট – এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলছিল আমিরাত। কিন্তু সম্প্রতি ইরানের সহস্রাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। দুবাই বিমানবন্দর, বুর্জ আল আরব হোটেল এবং পাম জুমেইরাহ দ্বীপের মতো বিশ্বখ্যাত পর্যটন এলাকায় ইরানি হামলার ক্ষয়ক্ষতি আমিরাতকে এমন কঠোর পথে হাঁটতে বাধ্য করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সম্পদ জব্দের এই সিদ্ধান্ত আমিরাতের জন্য ঝুঁকিমুক্ত নয়। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এমন পদক্ষেপের পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান আমিরাতের জ্বালানি অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি হামলা চালাতে পারে। এছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিতর্কিত বা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর উৎস থেকে আসা পুঁজি আকর্ষণে আমিরাতের যে সুনাম রয়েছে, তা-ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে লেনদেন হওয়া প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের গোপন ইরানি কার্যক্রমের হদিস মিলেছে। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ অর্থই আমিরাত-ভিত্তিক বিভিন্ন কোম্পানি গ্রহণ করেছে, যা মূলত দুবাইতে থাকা ইরান সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর তেল বিক্রির অর্থ।
আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে তারা তেহরানকে এই কঠোর পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
রিপোর্টারের নাম 



















